ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগের দিন সৈয়দপুর বিমানবন্দরে জব্দ হওয়া ৭৪ লাখ টাকা ফেরত চেয়ে আদালতে আবেদন করেছেন ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির বেলাল উদ্দিন প্রধান। টাকাটি ব্যবসায়িক লেনদেনের বলে দাবি করে তিনি আদালতে একটি চুক্তিপত্রসহ কয়েকটি নথি জমা দিয়েছেন। তবে ওই চুক্তিপত্রের সত্যতা ও অর্থের উৎস নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন তদন্তকারীরা। আদালতের নির্দেশে বিষয়টি তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নির্বাচনের আগের দিন বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ বহন করায় শুরু থেকেই বিষয়টি সন্দেহের মধ্যে ছিল। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, অর্থটি নির্বাচনে অবৈধ প্রভাব বিস্তার বা ভোট কেনার উদ্দেশ্যে বহন করা হচ্ছিল কি না। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করতে রাজি নন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তদন্তে বেলাল উদ্দিন প্রধানের মালিকানাধীন ‘সোনামনি ড্রেস হাউস’, স্থানীয় বাসিন্দা এবং যেখান থেকে অর্থ নেওয়ার দাবি করা হয়েছে, সেই প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও কথা বলা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র বলছে, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার হাজীপাড়া এলাকায় বেলাল উদ্দিন প্রধানের মালিকানাধীন ‘সোনামনি ড্রেস হাউস’ নামে একটি ছোট পোশাক তৈরির কারখানা রয়েছে। সেখানে ৮ থেকে ১০টি সেলাই মেশিনে ১২ থেকে ১৫ জন কর্মী কাজ করেন। স্থানীয়দের অনেকেই বলছেন, এমন প্রতিষ্ঠানের জন্য ৭৪ লাখ টাকার ব্যবসায়িক লেনদেন স্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে না।
তদন্তে পাওয়া আয়কর নথি অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ করবর্ষে বেলাল উদ্দিন প্রধানের বার্ষিক আয় ৪ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪১ টাকা এবং মোট সম্পদের মূল্য ২৪ লাখ ৪৪ হাজার ৮৬৭ টাকা। অন্যদিকে আদালতে দেওয়া নথিতে তিনি প্রায় ৭৫ লাখ টাকার ব্যবসায়িক লেনদেনের দাবি করেছেন।
গত ১১ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগের দিন ঢাকা থেকে বিমানে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর বেলাল উদ্দিন প্রধান ও জেলা জামায়াতের দপ্তর সম্পাদক আবদুল মান্নানকে আটক করে পুলিশ। তাঁদের সঙ্গে থাকা দুটি ব্যাগ থেকে ৭৪ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়। পরে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হলেও টাকা ও দুটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়।
নির্বাচনের পর বেলাল উদ্দিন প্রধান নীলফামারীর চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে জব্দ করা অর্থ ও মোবাইল ফোন ফেরত চেয়ে আবেদন করেন। আবেদনের সঙ্গে ট্রেড লাইসেন্স, নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে করা একটি চুক্তিপত্রসহ সাত পৃষ্ঠার নথি জমা দেন।
চুক্তিপত্রে উল্লেখ করা হয়, ঢাকার পল্টন এলাকার ‘বোন ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে গত ১০ ফেব্রুয়ারি রমজান ও ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ব্যবসার জন্য ৭৫ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চুক্তিপত্রে উল্লেখ করা ঠিকানায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পাওয়া যায়নি। একই ভবনে ‘সিএস গ্রুপ’ নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম রয়েছে। দুটি প্রতিষ্ঠানের মালিক হিসেবে মোহাম্মদ বেলাল হোসাইনের নাম পাওয়া গেছে।
মোহাম্মদ বেলাল হোসাইন কালবেলাকে বলেন, এটি ব্যবসায়িক লেনদেন ছিল এবং বেলাল উদ্দিন প্রধানকে ব্যবসার প্রয়োজনে অর্থ দেওয়া হয়েছিল। কেন ব্যাংকিং চ্যানেলের পরিবর্তে নগদ অর্থ দেওয়া হয়েছে—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ব্যবসায় অনেক সময় নগদেও লেনদেন হয়।
আদালতের নির্দেশে সৈয়দপুর থানা পুলিশ নথিগুলো যাচাই করে মতামত দেয় যে, চুক্তিপত্র ও অন্যান্য নথির সত্যতা যাচাইয়ে সিআইডির বিশেষজ্ঞ তদন্ত প্রয়োজন। বর্তমানে সিআইডির ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম বিভাগ বিষয়টি তদন্ত করছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অর্থের প্রকৃত উৎস, লেনদেনের বাস্তবতা, চুক্তিপত্রের সত্যতা এবং টাকাগুলোর সঙ্গে কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আদালতে দাখিল করা চুক্তিপত্রটি ঘটনার আগে নাকি পরে তৈরি হয়েছে, সেটিও ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা হবে।
বেলাল উদ্দিন প্রধান বলেন, বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন। চুক্তিপত্রে ৭৫ লাখ টাকা উল্লেখ থাকলেও ৭৪ লাখ টাকা জব্দ হওয়ার বিষয়ে তাঁর দাবি, বাকি এক লাখ টাকা তাঁর হাতে ও পকেটে ছিল, যা পরে আর পাওয়া যায়নি।
তিনি আরও বলেন, বিমানবন্দরে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেই তিনি অর্থ নিয়ে বিমানে উঠেছিলেন। কেন তাঁকে আটক করা হয়েছে, সেটি তিনি বুঝতে পারেননি।
সিআইডির এক কর্মকর্তা বলেন, আদালতের নির্দেশে তদন্ত চলছে। অর্থটি ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহারের জন্য বহন করা হচ্ছিল—এমন প্রমাণ পাওয়া গেলে সে অনুযায়ী প্রতিবেদন দেওয়া হবে। আবার অন্য কোনো তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে সেটিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হবে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
Leave a comment