ইউরোপের শিল্প ও বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ রাইন নদী তীব্র খরার কারণে সংকটে পড়েছে। পানির স্তর রেকর্ড পরিমাণ কমে যাওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে পণ্য পরিবহন। বড় জাহাজ কম পণ্য নিয়ে চলতে বাধ্য হচ্ছে, আর কোথাও কোথাও পণ্য নামিয়ে ছোট নৌযান, ট্রাক ও রেলপথে পরিবহন করতে হচ্ছে। এতে বেড়েছে পরিবহন ব্যয়, যার প্রভাব পড়ছে শিল্প উৎপাদন ও অর্থনীতিতে।
চলতি গ্রীষ্মে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ইউরোপজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহ, দাবানল ও অস্বাভাবিক আবহাওয়ার পর এবার দেখা দিয়েছে ব্যাপক খরা। এর ফলে রাইনসহ মহাদেশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নদীর পানির স্তর উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
সুইস আল্পস থেকে উত্তর সাগর পর্যন্ত প্রায় ৮০০ মাইল দীর্ঘ রাইন নদী ছয়টি দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ইউরোপের শিল্পাঞ্চলগুলোর জন্য এটি অন্যতম প্রধান পরিবহনপথ। আইএনজি ব্যাংকের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক গবেষণা বিভাগের প্রধান কার্সটেন ব্রজেস্কি বলেন, ‘রাইন জার্মান অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাণপ্রবাহ।’
১৮৮০ সালের পর সর্বনিম্ন পানির স্তর
চলতি সপ্তাহে রাইন নদীর পানির স্তর ১৮৮০ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। ওই বছর থেকেই সরকারি পর্যায়ে নদীর পানির স্তর পরিমাপ শুরু হয়।
পানির গভীরতা কমে যাওয়ায় জাহাজগুলো পূর্ণ ধারণক্ষমতায় চলাচল করতে পারছে না। কোথাও কোথাও নিরাপদে চলাচলের জন্য জাহাজকে দুই-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত পণ্য খালাস করতে হচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে জার্মানির শিল্প খাতে। কিছু প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমানোর আশঙ্কা করছে।
একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে ইউরোপের দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী দানিয়ুবেও। পানির স্তর এতটাই কমেছে যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ডুবে যাওয়া কয়েকটি যুদ্ধজাহাজের ধ্বংসাবশেষ দৃশ্যমান হয়েছে। দানিয়ুবের পানি ব্যবহার করে হাঙ্গেরি ও রোমানিয়ার পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লি শীতল রাখা হয়। পানির সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কমছে জাহাজের বহনক্ষমতা
জার্মানির ডুইসবুর্গ বন্দরে বড় জাহাজ থেকে পণ্য ছোট নৌযান, ট্রাক ও রেলপথে স্থানান্তর করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও নদীর গভীরতা চার ফুটের সামান্য বেশি থাকায় বড় জাহাজগুলো স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম পণ্য বহন করছে।
রটারডাম থেকে লৌহ আকরিক বহনকারী ৫৬৪ ফুট দীর্ঘ জাহাজ ডব্লিউ. ডি. বেইজার সিনিয়র–এর নাবিক উইলমা ভ্যান ইনজেন বলেন, এখন বোঝা যায় কে দক্ষ নাবিক। স্বাভাবিক সময়ে তাঁদের জাহাজে ৫ হাজার টন পণ্য বহন করা গেলেও এখন তা কমে মাত্র ১ হাজার ২০০ টনে নেমে এসেছে।
ডুইসবুর্গ বন্দরের প্রধান নির্বাহী মার্কুস বাঙ্গেন বলেন, বিদ্যমান পরিস্থিতির মধ্যেই কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন তাঁরা।
শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাইন
জার্মানির শিল্প বিকাশে রাইন নদীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নদীর তীরে গড়ে উঠেছে বিএএসএফ, মার্সিডিজ-বেঞ্জ, বায়ার ও থাইসেনক্রুপের মতো বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান। প্রতি বছর প্রায় ৩০ কোটি টন পণ্য এই নদীপথে পরিবহন করা হয়। উত্তর সাগরের রটারডাম বন্দরকে জার্মানির প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোর সঙ্গে যুক্ত করেছে রাইন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি বড় নৌযানের পণ্য পরিবহনের বিকল্প হিসেবে প্রায় ১০০টি ট্রাক অথবা একটি পূর্ণাঙ্গ মালবাহী ট্রেন প্রয়োজন হতে পারে। তবে রেলপথেও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও চলমান নির্মাণকাজের কারণে বিকল্প ব্যবস্থাও চ্যালেঞ্জের মুখে।
অর্থনীতিতে বাড়ছে চাপ
২০১৮ সালের ভয়াবহ খরার সময় রাইন নদীর পানির স্তর কমে যাওয়ায় কয়েকটি কারখানা উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছিল। সে সময় জার্মানির মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রায় শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ কমেছিল বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
জার্মান অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন শিল্প সংগঠনের পরিচালক ইয়েন্স শোয়ানেন বলেন, ‘পানি তো জাদুর মতো তৈরি করা সম্ভব নয়।’
তবে আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান গভীর পানির বন্দরে অতিরিক্ত মজুত সুবিধা তৈরি করেছে। কম পানিতে চলাচল করতে সক্ষম নতুন ধরনের জাহাজও নির্মাণ করা হচ্ছে। তবু রাইন নদীতে চলাচলকারী প্রায় ৮ হাজার পণ্যবাহী জাহাজের মধ্যে এ ধরনের জাহাজের সংখ্যা এখনও খুবই কম।
জার্মানির কার্টেল অফিস জানিয়েছে, নদীপথে জ্বালানি পরিবহনে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ভোক্তাদের প্রতি লিটার পেট্রলের জন্য অতিরিক্ত ১১ সেন্ট পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে।
জার্মানির কিল ইনস্টিটিউট ফর দ্য ওয়ার্ল্ড ইকোনমির বিশ্লেষণ বলছে, দীর্ঘ সময় পানির স্তর কম থাকলে দেশের শিল্প উৎপাদন প্রায় ১ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আল্পস অঞ্চলে শীতকালে তুষারপাত কম হওয়ায় এ বছর রাইন নদীতে পানির প্রবাহও কমেছে। পরে বৃষ্টিপাতের ঘাটতি এবং দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক সপ্তাহেও ইউরোপের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টির সম্ভাবনা কম। ফলে রাইন নদীর পানির স্তর আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা ইউরোপের শিল্প ও অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
Leave a comment