হবু স্বামীকে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগে ভারতের মহারাষ্ট্রে এক তরুণী ও তার প্রেমিককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক প্রকাশ করে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা করলেও, পুলিশি তদন্তে বেরিয়ে এসেছে এক রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের চিত্র। জানা গেছে, প্রেমিক চেতন বাবুলাল চৌধুরীর (২২) সঙ্গে একটি ক্যাফেতে বসে বাগদত্তাকে পাহাড় থেকে ফেলে হত্যার চূড়ান্ত পরিকল্পনা করেছিলেন সিয়া গোয়াল নামের ওই তরুণী।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নিহত যুবকের নাম কেতন আগারওয়াল (২৬)। তিনি পুনের একটি প্রতিষ্ঠিত রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী পরিবারের সদস্য ছিলেন। গত ফেব্রুয়ারিতে সিয়ার সঙ্গে তার বাগদান সম্পন্ন হয় এবং আগামী নভেম্বরে তাদের জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ের অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল। ঘটনার পর সিয়া কেতনের পরিবারকে জানিয়েছিলেন, পাহাড়ে ট্রেকিংয়ের সময় পা পিছলে পড়ে গিয়ে কেতনের মৃত্যু হয়েছে।
তদন্তে জানা গেছে, কেতনকে লোহাগড় দুর্গে নিয়ে যাওয়ার জন্য দীর্ঘদিন ধরে চাপ দিচ্ছিলেন সিয়া। সহ্যাদ্রি পর্বতমালায় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩,৩০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত এই দুর্গে গত ৩১ মে তারা প্রথমবার ঘুরতে গিয়েছিলেন। ওই সফরের কয়েক দিন পরই সিয়া আবারও সেখানে যাওয়ার জন্য বায়না ধরেন। তবে কেতনের মা অনুমতি না দেওয়ায় সে সময় তাদের দ্বিতীয়বারের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি।
পরবর্তীতে ১৪ জুন আবারও দুর্গে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন সিয়া এবার কেতন রাজি হন। সেদিন সিয়া তাকে পাহাড়ের কিনারা থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তবে কেতন একটি ঝোপ আঁকড়ে ধরে নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম হন। কেতন তখন ধাক্কা দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে, সিয়া একটি সাপ দেখার মিথ্যা নাটক তৈরি করেন এবং এমনভাবে পরিস্থিতি উপস্থাপন করেন যেন তিনিই কেতনকে বাঁচিয়েছেন।
তদন্তকারীদের দাবি, গত ১৮ জুন সকালে পুনের একটি ক্যাফেতে দেখা করে সিয়া ও চেতন, কেতনকে হত্যার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেন। লোহাগড় দুর্গের কোন কোন স্থান থেকে তাকে গভীর খাদে ফেলে দেওয়া সম্ভব, সে বিষয়েও তারা বিস্তারিত ছক আঁকেন। পরে বিকেলে সিয়া কেতনকে নিয়ে আবারও দুর্গে যান। একই সময়ে চেতনও গোপনে তাদের অনুসরণ করে ট্রেকিংয়ে অংশ নেন। পাহাড়ি এই পথ অতিক্রম করতে সাধারণত তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় লাগে।
ট্রেকিং চলাকালে চেতন হাতের ইশারার মাধ্যমে সিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন। নিজের পরিচয় গোপন করতে তিনি গরমের মধ্যেও একটি হুডি পরে ছিলেন এবং দম্পতিকে অনুসরণ করছিলেন, যা পরবর্তীতে সিসিটিভি ফুটেজে স্পষ্ট দেখা যায়। পুলিশের অভিযোগ, দুর্গের এক নির্জন অংশে পৌঁছামাত্র সিয়া ও চেতন পেছন দিক থেকে কেতনকে ধাক্কা দিয়ে গভীর খাদে ফেলে দেন।
হত্যাকাণ্ডের পর তদন্তে নেমে পুলিশ ওই এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করে। সেখানে দেখা যায়, তীব্র গরমের (৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস) মধ্যেও এক ব্যক্তি হুডি এবং হেডসেট পরে ওই দম্পতিকে অনুসরণ করছেন। একটি ফুটেজে সিয়াকে পেছনের দিকে তাকাতে দেখে ওই হুডি পরিহিত ব্যক্তিটি দ্রুত নিচে বসে পড়েন। এই অস্বাভাবিক আচরণ ও গরমের মধ্যে হুডি পরার বিষয়টি গোয়েন্দাদের মনে সন্দেহের দানা বাঁধে।
পরবর্তীতে প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণে জানা যায়, গত সাত মাসে সিয়া ও চেতনের মধ্যে মোট ২,০০৪টি ফোনকল হয়েছে, যার মোট সময়কাল ছিল প্রায় ২৩৮ ঘণ্টা। গত বছরের দীপাবলি উৎসবে একটি পার্টিতে তাদের পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছিল। পুলিশ চেতনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছবির সাথে সিসিটিভি ফুটেজের ব্যক্তির মিল পেয়ে তাকে আটক করে। ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের মুখে চেতন ও সিয়া নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেন। চেতন জানান, সিয়া বাগদান ভেঙে পালিয়ে যেতে রাজি ছিলেন না, কারণ এতে পরিবারের অসম্মান হতো; তাই তারা কেতনকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার পথ বেছে নেন। বর্তমানে দুজনেই পুলিশি হেফাজতে রয়েছেন।
Leave a comment