Home আন্তর্জাতিক ইসরাইলি প্রশিক্ষণের জন্য ৮৯টি মরদেহ বিক্রি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়
আন্তর্জাতিকসাম্প্রতিক

ইসরাইলি প্রশিক্ষণের জন্য ৮৯টি মরদেহ বিক্রি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়

Share
Share

চিকিৎসা বিজ্ঞান ও গবেষণার প্রসারে সাধারণ মানুষের মরণোত্তর দেহদান একটি অত্যন্ত মানবিক ও মহৎ উদ্যোগ। কিন্তু সেই পবিত্র উদ্দেশ্যে দান করা মরদেহ যদি মানুষের অজান্তেই যুদ্ধক্ষেত্রের সামরিক মহড়া ও প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হয়, তবে তা নৈতিকতার চরম স্খলন বৈকি! যুক্তরাষ্ট্রের একটি শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে তেমনই এক স্তব্ধ করে দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ সামনে এনেছে কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা। অভিযোগ উঠেছে, বৈজ্ঞানিক গবেষণার উদ্দেশ্যে দান করা সাধারণ মানুষের মরদেহ মার্কিন নৌবাহিনীর মাধ্যমে ইসরায়েলি সামরিক চিকিৎসা দলের যুদ্ধকালীন অস্ত্রোপচার প্রশিক্ষণের জন্য সরবরাহ করা হয়েছে।

এই চাঞ্চল্যকর ও উদ্বেগজনক তথ্যটি প্রথম প্রকাশ্যে আসে যুক্তরাষ্ট্রের নেভাডায় কর্মরত মেডিক্যাল কেস ম্যানেজার মরিয়ম ভলপিনের কাছে। ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার (ইউএসসি) এক শিক্ষানবিশ সাংবাদিকের পাঠানো একটি অনুসন্ধানী বার্তার মাধ্যমে তিনি এই অনৈতিক বাণিজ্যের খবর পান। এই অভিযোগটি ঘিরে বর্তমানে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক আলোচনার ঝড় উঠেছে।

মরিয়ম ভলপিন আল জাজিরাকে গভীর ক্ষোভ ও হতাশা ব্যক্ত করে জানান, বিষয়টি জানতে পেরে তিনি মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছেন। কারণ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন বিমানবাহিনীর নার্স হিসেবে বীরত্বের সঙ্গে কাজ করা তাঁর নিজের মা মৃত্যুর পর নিজের শরীরটি গবেষণার উদ্দেশ্যে এই ইউএসসিতেই দান করেছিলেন। এখন তিনি চরম আশঙ্কার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন যে, তাঁর মায়ের পবিত্র মরদেহটিও হয়তো কোনো সামরিক বাহিনীর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মহড়ায় ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে।

একদল শিক্ষানবিশ সাংবাদিকের গভীর তদন্ত ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার কয়েকটি নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মার্কিন নৌবাহিনীর হাত ধরে ইসরায়েলি সামরিক চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণের জন্য এসব মরদেহ অনৈতিকভাবে সরবরাহ করেছিল। আর এই পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান হিসেবে নাম এসেছে ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার (ইউএসসি)।

প্রাপ্ত নথি ও প্রতিবেদনের চাঞ্চল্যকর তথ্যানুযায়ী, ২০১৮ সাল থেকে অন্তত শতাধিক মরদেহ এমন বিতর্কিত সামরিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে ব্যবহার করা হয়েছে। এসব মরদেহের ওপর যুদ্ধক্ষেত্রের মতো কৃত্রিম ও ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করে জরুরি শল্যচিকিৎসা (সার্জারি) প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। প্রশিক্ষণের কার্যকারিতা বাড়াতে মৃতদেহে কৃত্রিম উপায়ে রক্ত সঞ্চালনের ব্যবস্থা করা হতো, যাতে চিকিৎসকরা যুদ্ধক্ষেত্রে গুলিবিদ্ধ বা বোমা বিস্ফোরণে আহত সৈনিকদের বাঁচানোর বাস্তবসম্মত জরুরি অস্ত্রোপচার দক্ষতা অর্জন করতে পারেন।

তবে এই পুরো গোপন প্রক্রিয়াটি ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং মৃত ব্যক্তির ‘সম্মতি’ (Consent) নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে। দেহদানকারীরা সাধারণত পবিত্র বিশ্বাস থেকে সমাজকল্যাণের জন্য দেহদান করেন, তাঁরা কখনোই জানেন না যে তাঁদের মৃত্যুর পর মরদেহ এভাবে কোনো দেশের সামরিক বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হবে। এমনকি দেহদানকারীর পরিবারের সদস্যদেরও এই বাণিজ্যিক বা সামরিক চুক্তিগুলোর বিষয়ে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রাখা হতো বলে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

সমালোচকদের তীব্র বাণ ও নৈতিক প্রশ্নের মুখে ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া (ইউএসসি) আল জাজিরার করা প্রশ্নের জবাবে কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি। তারা কেবল দায়সারাভাবে জানিয়েছে, এটি একটি শিক্ষামূলক সাধারণ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি। তবে মানবাধিকার কর্মী ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণ মানুষের আবেগ ও বিশ্বাসকে পুঁজি করে সামরিক প্রশিক্ষণে মরদেহ ব্যবহারের এই জঘন্য কাণ্ডটি চিকিৎসা বিজ্ঞানের নৈতিক ও মানবিক ভিত্তিকে নতুন করে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।

এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি বিশ্বব্যাপী প্রকাশের পর মরণোত্তর দেহদান কর্মসূচির আইনগত ও নৈতিক দিক নিয়ে নতুন করে তীব্র বিতর্ক ও আইনি পর্যালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। সচেতন মহলের আশঙ্কা, এই ধরনের ভয়াবহ অস্বচ্ছতা ও অনৈতিকতা বজায় থাকলে ভবিষ্যতে মানবকল্যাণে দেহদান কর্মসূচির প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস চিরতরে নষ্ট হয়ে যাবে।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Don't Miss

নবম পে-স্কেল হলে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা অন্তর্ভুক্ত হবেন তিন শর্তে

নবম জাতীয় পে-স্কেল ঘোষিত হলে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের এর আওতায় নেওয়ার বিষয়টি সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত, আর্থিক সংশ্লেষ এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতির ওপর নির্ভর করবে...

ভেনিসে হামলা-লাঞ্ছনা: মামলা না করে বাংলাদেশে ফিরবেন না বাঁধন

ইতালির ভেনিসে হামলা ও লাঞ্ছনার ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করতে থানায় যাচ্ছেন অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন। তিনি জানিয়েছেন, মামলা না করে ভেনিস...

Related Articles

ঈশ্বরগঞ্জে জামায়াতে ইসলামীর দাওয়াতি সমাবেশ

  বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মাসব্যাপী গণসংযোগ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে দাওয়াতি...

৭ হাজার মিটার উঁচু থেকে চিকিৎসক আসমার লাশ উদ্ধার

বিশ্বের অন্যতম দুর্গম স্থান কারাকোরাম পর্বতমালা অঞ্চলের ৭ হাজার ২৭ মিটার উঁচু...

মাত্র ৪ মাসেই কুরআনের হাফেজ ৮ বছরের শিশু সাজিদ

কঠোর অধ্যবসায় ও অলৌকিক মেধার স্বাক্ষর রেখে মাত্র চার মাসে পবিত্র কুরআনের...

ঝোপে মিলল একাধিক মামলার আসামির মরদেহ : স্ত্রী বললেন, ‘পরিবার ধ্বংস করেছে’

চট্টগ্রামের কর্ণফুলীতে ঝোপঝাড়ের ভেতর থেকে দিল মোহাম্মদ (৪৮) নামে একাধিক মামলার এক...