ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে ধর্মীয় পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তিন মুসলিম তরুণকে অপহরণ, বর্বর নির্যাতন এবং লাখ টাকার সমপরিমাণ মালামাল ও অর্থ লুটে নেওয়ার এক উদ্বেগজনক ঘটনা সামনে এসেছে। গত ২৮ মে সন্ধ্যার দিকে রাজ্যের দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার ক্যানিং মহকুমার নরবুনিয়া গ্রামে এই পৈশাচিক হামলার ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, সম্পূর্ণ ধর্মীয় বিদ্বেষ থেকে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পরই এই পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়। তবে ঘটনার বেশ কয়েকদিন পার হয়ে গেলেও স্থানীয় থানা পুলিশ এখনো কোনো এফআইআর (FIR) নথিভুক্ত না করায় এবং মূল অপরাধীদের কাউকে গ্রেপ্তার করতে না পারায় স্থানীয় বাসিন্দা, সচেতন মহল ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।
গুরুতর নির্যাতনের শিকার ওই তিন তরুণ হলেন—রাজিবুল মোল্লা, জহির মোল্লা এবং হাফিজুল মোল্লা। তাঁরা সবাই ক্যানিংয়ের নরবুনিয়া গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা।
ভুক্তভোগীদের পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২৮ মে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মিতখালি ও মৌখালি অঞ্চলের সংযোগকারী স্থানীয় ‘ভাইরাল ব্রিজ’-এর কাছে একটি গাছের নিচে বসে মোবাইল ফোন ব্যবহার করছিলেন ওই তিন তরুণ। এ সময় একদল অজ্ঞাতপরিচয় উগ্রপন্থী যুবক অতর্কিতে তাঁদের কাছে এসে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। একপর্যায়ে তাঁদের নাম ও ধর্মীয় পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পরপরই ওই যুবকেরা লাঠিসোঁটা নিয়ে তাঁদের ওপর চড়াও হয় এবং এলোপাতাড়ি মারধর শুরু করে।
লিখিত অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, প্রাথমিক মারধরের পর ওই তিন তরুণকে জোরপূর্বক একটি অজ্ঞাত ও নির্জন স্থানে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁদের একটি বদ্ধ ঘরে আটকে রেখে দ্বিতীয় দফায় মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন চালানো হয়। একপর্যায়ে অপহরণকারীরা ভুক্তভোগীদের পরিবারের কাছে তাঁদের মুক্তির জন্য নগদ ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। শুধু তাই নয়, নির্যাতনের মুখে তিন তরুণের কাছে থাকা নগদ ১৫ হাজার টাকা, ৩টি মূল্যবান মোবাইল ফোন এবং ২টি মোটরসাইকেল জোরপূর্বক কেড়ে নেয় দুর্বৃত্তরা।
লোমহর্ষক ও শ্বাসরুদ্ধকর সেই নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে গুরুতর আহত তরুণ রাজিবুল মোল্লা জানান, “আমাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে তুলে নিয়ে গিয়ে মোটা অঙ্কের টাকার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছিল। আমরা এত টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় আমাদের অমানুষিক মারধর করা হয়। নির্যাতনের একপর্যায়ে আমাকে জোর করে একটি অবৈধ বন্দুক হাত দিয়ে ধরিয়ে দিয়ে মোবাইল ক্যামেরায় ভিডিও রেকর্ড করা হয় এবং আমাদের মুখ দিয়ে জোরপূর্বক সমাজবিরোধী ও আপত্তিকর কথাবার্তা বলতে বাধ্য করা হয়।” মূলত পরবর্তীতে ব্লাকমেইল করার উদ্দেশ্যেই অপরাধীরা এই ভিডিও ধারণ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার পর ক্যানিং থানায় যোগাযোগ করা হলেও পুলিশের চরম নিষ্ক্রিয়তা ও উদাসীনতার অভিযোগ তুলেছে ভুক্তভোগীদের পরিবার। আহত এক তরুণের বাবা হোসেন মোল্লা গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ঘটনার রাতেই তিনি সশরীরে থানায় গিয়ে অপহরণ, ধর্মীয় হেনস্তা ও সশস্ত্র হামলার বিষয়ে বিস্তারিত জানালেও পুলিশ কেবল একটি দায়সারা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেই নিজেদের দায়িত্ব শেষ করেছে। ঘটনার এত দিন পরেও পুলিশ কোনো আনুষ্ঠানিক এফআইআর (FIR) দায়ের করেনি, কোনো মালামাল উদ্ধার করতে পারেনি এবং ঘটনার সাথে জড়িত চিহ্নিত অপরাধীদের কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
Leave a comment