Home জাতীয় ভুয়া নথিতে বিমানের ৮ পাইলটের চাকরি: জীবনের নিরাপত্তা কোথায়?
জাতীয়

ভুয়া নথিতে বিমানের ৮ পাইলটের চাকরি: জীবনের নিরাপত্তা কোথায়?

Share
জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স
Share

জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে কর্মরত ৮ পাইলটের বিরুদ্ধে ভুয়া উড্ডয়ন ঘণ্টা, জাল লগবুক এবং তথ্য গোপন করে চাকরি নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। একই সময়ে সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ চিফ অব ফ্লাইট সেফটি পদে দায়িত্ব পেয়েছেন ক্যাপ্টেন আহমেদ ইমরান, যার বিরুদ্ধেও আগে থেকে অসদাচরণ ও শৃঙ্খলাভঙ্গের একাধিক অভিযোগ রয়েছে। এই দুটি বিষয়কে ঘিরে সংস্থাটির অভ্যন্তরে উদ্বেগ ও আলোচনা তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রাথমিক গোপন অনুসন্ধানে ৮ পাইলটের বিরুদ্ধে তথ্য গোপন, ভুয়া নথি ব্যবহার, জাল লগবুক এবং উড্ডয়ন ঘণ্টা বাড়িয়ে দেখিয়ে বাণিজ্যিক ও পরিবহন পাইলট লাইসেন্স অর্জনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি তদন্তে বিমান কর্তৃপক্ষ চার সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

অনুসন্ধান প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কয়েকজন পাইলটের ক্ষেত্রে নির্ধারিত উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা ছাড়াই লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্যাপ্টেন আব্দুর রহমান আকন্দের বাণিজ্যিক পাইলট লাইসেন্সের জন্য প্রয়োজন ছিল ২৫০ ঘণ্টা উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা। অথচ তার লগবুকে পাওয়া গেছে মাত্র ১৫৪.৩৫ ঘণ্টা। প্রায় ৯৫ ঘণ্টা ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও তিনি প্রায় চার মাস ফ্লাইট পরিচালনা করেন।

ক্যাপ্টেন ফারিয়েল বিলকিস আহমেদের লাইসেন্সে একই উড্ডয়ন ঘণ্টা পাইলট ইন কমান্ড ও কো-পাইলট হিসেবে দুবার লিপিবদ্ধ করার অভিযোগ রয়েছে। এতে প্রায় ৩৫০ ঘণ্টার অসামঞ্জস্য ধরা পড়ে।

ক্যাপ্টেন আনিসের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ২০০ ঘণ্টার পরিবর্তে মাত্র ১৬২ ঘণ্টা ৪০ মিনিট উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও তাকে লাইসেন্স দেওয়া হয়।

ক্যাপ্টেন বাসিত মাহতাবের নথিতে পাইলট ইন কমান্ড হিসেবে উড্ডয়ন সময় ছিল মাত্র ৩৩ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট, যা পরে জাল সনদের মাধ্যমে ১৫৫ ঘণ্টা দেখানো হয়।

এ ছাড়া ক্যাপ্টেন নুরুদ্দিন আহমেদ, ইউসুফ মাহমুদ ও মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

প্রাথমিক অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, শুধু পাইলটদের ক্ষেত্রেই নয়, লাইসেন্স যাচাই ও তদারকি ব্যবস্থাতেও গুরুতর অনিয়ম রয়েছে। কিছু ফ্লাইট পরিদর্শকের বৈধ লাইসেন্স, শারীরিক সক্ষমতা ও সাম্প্রতিক উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও তারা পাইলট যাচাইয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। এতে পুরো লাইসেন্সিং ব্যবস্থাই প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যাপ্ত উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা ছাড়া পাইলট দিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা করলে জরুরি পরিস্থিতিতে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায় এবং বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়।

এদিকে সংস্থার চিফ অব ফ্লাইট সেফটি পদে নিয়োগ পাওয়া ক্যাপ্টেন আহমেদ ইমরানের বিরুদ্ধেও অতীতে অসদাচরণ ও শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ ছিল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগ অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে নারী কেবিন ক্রু ও ফার্স্ট অফিসারদের প্রতি আপত্তিকর আচরণ, ককপিটে অশোভন ভাষা ব্যবহার এবং অনৈতিক মন্তব্য করার অভিযোগ ওঠে। ২০২৩ সালের ৫ এপ্রিল করা একটি লিখিত অভিযোগে এসব বিষয় উল্লেখ করা হয়। ওই অভিযোগে বলা হয়, তার আচরণের কারণে ককপিটের পরিবেশ অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে এবং কয়েকজন নারী ক্রু তার সঙ্গে ফ্লাইট পরিচালনায় অনাগ্রহ প্রকাশ করেন।

এ ছাড়া নিষিদ্ধ এপ্রন এলাকায় ধূমপান, স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) লঙ্ঘন এবং ফ্লাইটের আগে ব্রেথালাইজার অ্যালকোহল পরীক্ষায় অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানানোর মতো ঘটনার অভিযোগেও তাকে সতর্কতামূলক চিঠি দেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে।

বেসামরিক বিমান চলাচল বিধি অনুযায়ী, ফ্লাইট সেফটি প্রধান পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষায়িত সেফটি প্রশিক্ষণ, সেফটি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম সম্পর্কে সুস্পষ্ট জ্ঞান এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার গ্রহণযোগ্যতা থাকা প্রয়োজন। অভিযোগকারীদের দাবি, ক্যাপ্টেন ইমরান পূর্ণাঙ্গ কোনো বিশেষায়িত সেফটি কোর্স সম্পন্ন করেননি; কেবল কয়েকটি সেমিনারে অংশ নিয়েছেন।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, “জাল সনদ ব্যবহার করে যারা পাইলট হিসেবে চাকরি করছেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে লাইসেন্স প্রদানকারী সংস্থা হিসেবে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষও দায় এড়াতে পারে না।”

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক মুহাম্মাদ কাউছার মাহমুদ বলেন, অভিযোগ ওঠা লাইসেন্সগুলো তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

তবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ক্যাপ্টেন আহমেদ ইমরানের সঙ্গেও একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

 

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Don't Miss

হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে সারজিস আলমকে

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান সারজিস আলম হঠাৎ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। মঙ্গলবার...

অসত্য তথ্য ছড়িয়েছে মিডিয়া: বাতিল হয়নি ড. ইউনূসের ভিভিআইপি মর্যাদা

সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ভিভিআইপি মর্যাদা ও নিরাপত্তা সময়সীমা কমিয়ে আনা হয়েছে বলে বেশ কিছু গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদকে ‘অসত্য’ এবং ‘বিভ্রান্তিকর’...

Related Articles

আজকে নতুন করে আবিষ্কার করলাম আপনি শিশু মুক্তিযোদ্ধা

জাতীয় সংসদে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও সংসদ সদস্য সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ...

ঢাকা বার নির্বাচন, চলছে দ্বিতীয় দিনের ভোটগ্রহণ

ঢাকা আইনজীবী সমিতি নির্বাচনের দ্বিতীয় দিনের ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায়...

নেত্রকোনায় প্রকৃতির রোষে কৃষকের স্বপ্নভঙ্গ: ৪০০ হেক্টর বোরো ধান পানির নিচে

এক বছরের কষ্টের ফসল যখন ঘরে তোলার সময়, ঠিক তখনই প্রকৃতির নিষ্ঠুর...

প্যারোলে মেলেনি মুক্তি, কারাফটকে বাবাকে শেষ দেখা দেখলেন ছাত্রলীগ নেতা

হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে বাবার মৃত্যুর পর শেষবারের মতো মরদেহ দেখতে প্যারোলে মুক্তি...