লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মানদেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ হুতিদের কাছ থেকে পুনরুদ্ধারে ইয়েমেনে বড় ধরনের সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌদি আরব। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এ অভিযান শুরু হতে পারে বলে আঞ্চলিক ও পশ্চিমা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানিয়েছে রয়টার্স।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য এই অভিযানে মূল স্থল লড়াই চালাবে রিয়াদের তত্ত্বাবধানে থাকা ইয়েমেনি বাহিনী। তাদের সহায়তায় সৌদি বিমানবাহিনী অভিযান পরিচালনা করতে পারে। ছয়জন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সৌদির মিত্ররা সরাসরি যুদ্ধ অভিযানে অংশ নেবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সৌদি আরব সম্ভাব্য অভিযানের জন্য দুটি পরিকল্পনা বিবেচনা করছে বলে জানিয়েছেন উপসাগরীয় ও ইয়েমেনি কর্মকর্তারা। প্রথম পরিকল্পনায় বাব আল-মানদেব প্রণালি ও আশপাশের এলাকায় সীমিত পরিসরে সামরিক অভিযান চালানোর কথা রয়েছে। দ্বিতীয় পরিকল্পনাটি তুলনামূলকভাবে বড়। এতে আল-বাইদা, মারিব, তাইজ ও আল-জাওফ প্রদেশে একযোগে একাধিক ফ্রন্টে অভিযান চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
অভিযানের পরিসর অনুযায়ী এক লাখের বেশি ইয়েমেনি যোদ্ধাকে মোতায়েন করা হতে পারে বলেও কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানিয়েছে রয়টার্স। তবে অভিযান শুরুর নির্দিষ্ট তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
বাব আল-মানদেব লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক প্রবেশপথ। ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যিক নৌ চলাচলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
গত মাসে হুতিরা ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে দ্রুত অগ্রসর হয়ে মোখা বন্দরসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা দখল করে। এরপর তারা বাব আল-মানদেবের কাছাকাছি অবস্থান শক্ত করে। এতে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে তাদের কৌশলগত প্রভাব বেড়েছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
সৌদি কর্মকর্তাদের দৃষ্টিতে, বাব আল-মানদেবের আশপাশে হুতিদের নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত থাকলে ইয়েমেনের শান্তি আলোচনা নতুন করে শুরু করাও কঠিন হতে পারে। তাই সম্ভাব্য অভিযানের অন্যতম লক্ষ্য হলো উপকূলীয় এলাকায় আগের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র সৌদি অভিযানে গোয়েন্দা সহায়তা দিচ্ছে বলে এক পশ্চিমা কূটনীতিক জানিয়েছেন। তবে সরাসরি যুদ্ধে মার্কিন বাহিনী অংশ নেবে কি না, তা স্পষ্ট নয়। তুরস্ক ও পাকিস্তান সৌদি আরবকে সামরিক সরঞ্জাম ও অন্যান্য সহায়তা দিচ্ছে বলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
তবে ইয়েমেনে সরাসরি যুদ্ধ করার জন্য পাকিস্তানি সেনা পাঠানোর কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন দেশটির এক কর্মকর্তা। এদিকে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার জানিয়েছেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির সদস্যদের জরুরি বৈঠক আগামী সপ্তাহে রিয়াদে হতে পারে।
সম্ভাব্য এই সামরিক অভিযানে সৌদি আরবকে মূলত ইয়েমেনের বিভিন্ন হুতিবিরোধী বাহিনীর ওপর নির্ভর করতে হবে। কিন্তু এসব বাহিনীর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিভাজন ও সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। বড় ও দীর্ঘস্থায়ী অভিযান পরিচালনার জন্য তারা কতটা প্রস্তুত, সেটিই সৌদির পরিকল্পনার অন্যতম বড় প্রশ্ন। ফলে অভিযানের ফলাফল অনেকাংশে স্থানীয় ইয়েমেনি বাহিনীর সক্ষমতা ও পারস্পরিক সমন্বয়ের ওপর নির্ভর করতে পারে।
এদিকে ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত তীব্র হলে মানবিক পরিস্থিতিও আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (WFP) তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, নতুন লড়াইয়ের কারণে সরকার-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় প্রতি চারটি পরিবারের মধ্যে তিনটি পরিবার খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।
তবে এখন পর্যন্ত সৌদি আরবের সম্ভাব্য সামরিক অভিযানটি পরিকল্পনার পর্যায়েই রয়েছে। অভিযান শুরু হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত নয়।
Leave a comment