Home আন্তর্জাতিক ‘বাংলাদেশি’ অপবাদে পুশব্যাক: ভারতে ফিরেও চরম অনাহারে ও আতঙ্কে দিন কাটছে মজলুম মুসলিমদের
আন্তর্জাতিকজাতীয়সাম্প্রতিক

‘বাংলাদেশি’ অপবাদে পুশব্যাক: ভারতে ফিরেও চরম অনাহারে ও আতঙ্কে দিন কাটছে মজলুম মুসলিমদের

Share
Share

“সংসার দেখব নাকি পুলিশ আর বিএসএফের ভয় করব? শেষমেশ পেটের তাগিদে ভয়ের ওপর পরিবারকেই স্থান দিতে হলো।”— ভাঙা গলায়, অত্যন্ত ক্ষোভ ও আক্ষেপের সাথে কথাগুলো বলছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের ভগবানগোলার বাসিন্দা মেহবুব শেখ। মাত্র এক বছর আগে ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাই থেকে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ বা ‘বাংলাদেশি মুসলিম’ সন্দেহে উগ্র হিন্দুত্ববাদী মানসিকতার পুলিশ প্রশাসন তাকে অন্যায়ভাবে আটক করেছিল। কয়েকদিন অমানুষিক বন্দিদশায় রাখার পর, রাতের অন্ধকারে খাঁচায় বন্দি পশুর মতো ট্রেনে করে এনে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল বাংলাদেশের সীমান্তে।

পরবর্তীতে বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর (বিজিবি-বিএসএফ) পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে অকাট্য নথিপত্র পেশ করে প্রমাণিত হয় যে, তারা কোনো অনুপ্রবেশকারী নন, বরং খাঁটি ভারতীয় নাগরিক। সুপ্রিম কোর্টের কড়া নির্দেশ ও দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর তাদের স্বদেশে ফিরিয়ে নেওয়া হলেও, নির্মম বাস্তবতা হলো— জন্মভিটায় ফিরে এই মজলুম মুসলিমরা পাননি কোনো রাষ্ট্রীয় পুনর্বাসন, মেলেনি কোনো সরকারি সহায়তা। ফলে, তীব্র অর্থকষ্ট আর ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে আবারও তাদের ফিরে যেতে হচ্ছে সেই মুম্বাই কিংবা কাশ্মীরের মতো উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায়।

মুর্শিদাবাদের বেলডাঙার বাসিন্দা মিনারুল শেখ পরচুলা (উইগ) তৈরির কাঁচামাল বা চুল সংগ্রহের ব্যবসা করতেন। পুশব্যাকের সেই অভিশপ্ত ঘটনার পর গ্রামে ফিরে তার পুরো ব্যবসাটাই ধ্বংস হয়ে গেছে। মিনারুল জানান, “আমি যখন ‘বাংলাদেশি’ অপবাদ নিয়ে ফিরে এলাম, তখন বাজারে যাদের কাছে আমার লাখ লাখ টাকা পাওনা ছিল, তারা তা দিতে পরিষ্কার অস্বীকার করল। উল্টো নিজের দেনা শোধ করতে পৈত্রিক এক বিঘা জমি বিক্রি করে আজ আমি নিঃস্ব। সরকার বা প্রশাসন থেকে একটা টাকাও সাহায্য পাইনি।” নিজেদের রাজ্যে কাজ না পেয়ে এবং উগ্র হিন্দুত্ববাদী প্রশাসনের ডর-ভয় উপেক্ষা করে মিনারুল এখন সুদূর কাশ্মীরে গিয়ে পুনরায় ভাগ্য অন্বেষণের লড়াই করছেন। যেকোনো মুহূর্তে আবার ‘সন্দেহভাজন’ হিসেবে গ্রেপ্তার হওয়ার আতঙ্ক থাকলেও পেটের টানে এই ঝুঁকি নিতে বাধ্য হয়েছেন তিনি।

পূর্ব বর্ধমানের ৫৩ বছর বয়সী প্রবীণ বাসিন্দা মোস্তফা কামাল শেখ বর্ণনা করেন সেই রোমহর্ষক ও পৈশাচিক পুশব্যাকের অভিজ্ঞতা। মুম্বাইয়ে প্রায় ১০ বছর ধরে ঝালমুড়ি বিক্রি করে সংসার চালাতেন তিনি। গত বছর আকস্মিকভাবে তাকে তুলে নিয়ে গিয়ে আধার কার্ড, ভোটার কার্ডসহ সব নথিপত্র কেড়ে নেওয়া হয়। মোস্তফা বলেন, “আমাদের পুনে থেকে বিএসএফের বিশেষ বিমানে করে ত্রিপুরার আগরতলায় ওড়ানো হয়। সেখান থেকে বাসে করে বাংলাদেশ সীমান্তের এক অন্ধকার জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয়। রাত তখন ৩টা। আমাদের হাতে একটা পানির বোতল, সামান্য খাবার আর ৩০০ বাংলাদেশি টাকা গুঁজে দিয়ে বিএসএফের জওয়ানেরা লাঠি উঁচিয়ে তাড়া করে। চিৎকার করে বলে— ‘ওপারে ভাগো, আর কখনো এ মুখে আসবি না।’ আমরা অন্ধকারে প্রাণের ভয়ে দৌড়ে বাংলাদেশের সীমানায় ঢুকি।” পরে বাংলাদেশের মুসলিম গ্রামবাসীদের মানবিক আশ্রয় ও বিজিবির সহায়তায় তারা প্রাণে রক্ষা পান।

মোস্তফা কামাল শেখ জানান, পশ্চিমবঙ্গে ফিরে এসে গ্রামে কাজ করে দৈনিক মাত্র ২৫০-৩০০ টাকা আয় হতো, যা দিয়ে সংসার চলে না। তাই আধার-ভোটার কার্ড নতুন করে তুলে আবারও মুম্বাইয়ের নালাসোপারায় ফিরে গেছেন তিনি। যদিও আইনি মারপ্যাঁচে তার বৃদ্ধা মায়ের নাগরিকত্ব এখনো ট্রাইব্যুনালে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।

ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করে জানান, তারা যখন বাংলাদেশ থেকে ভারতের মাটিতে পা রাখেন, পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) স্থানীয় নেতারা কেন্দ্রে থাকা বিজেপি সরকারকে চাপে ফেলতে তাদের নিয়ে ব্যাপক রাজনীতি করেছিলেন। মেহবুব ও শামীমদের গলায় মালা দিয়ে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল, প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল স্থায়ী কর্মসংস্থানের। কিন্তু ক্যামেরা সরে যেতেই নেতারাও উধাও। পশ্চিমবঙ্গে দৈনিক মজুরি মাত্র ৬৫০ টাকা, যা নিয়মিত পাওয়াও যায় না। অথচ মুম্বাইয়ে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটলে মাসে ৩৫ থেকে ৪৫ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব। ফলে, ক্ষুধার্ত পেটের কাছে রাষ্ট্রীয় হেনস্থার ভয় আজ পরাজিত।

এই ট্র্যাজেডির সবচেয়ে নির্মম শিকার বীরভূমের সুনালি খাতুন। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় তাকে দিল্লি থেকে ধরে বাংলাদেশে পুশইন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টের কড়া নির্দেশে গত বছরের ডিসেম্বরে সুনালি ও তার আট বছরের ছেলেকে ভারতে ফিরিয়ে নেওয়া হলেও, তার স্বামী দানিশকে এখনও বাংলাদেশে রেখে দেওয়া হয়েছে। ভারতে ফিরে আসার পর সুনালি এক পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। তখন সস্তা রাজনীতির অংশ হিসেবে তৃণমূলের শীর্ষ নেতা অভিষেক ব্যানার্জি তাকে হাসপাতালে দেখতে গিয়ে নবজাতকের নাম রেখেছিলেন ‘আপন’।

আজ বীরভূম থেকে কান্নাভেজা কণ্ঠে সুনালি বলেন, “নেতারা আমার বাচ্চার নাম ‘আপন’ রেখেছিলেন ঠিকই, কিন্তু এই দেশে আমাদের আপন করার মতো কেউ নেই। আমার ভাই টোটো চালিয়ে দিনে ২০০ টাকা পায়, তা দিয়ে আমাদের খাওয়া জোটে না। আমার স্বামী এখনও ওপারে আটকে পড়ে আছেন, দিনের পর দিন উনার সাথে কোনো যোগাযোগ নেই। এই বাচ্চাদের নিয়ে আমি এখন কোথায় যাব?”

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Don't Miss

হজ ও ওমরাহে গিয়ে ভিক্ষা না করার নির্দেশ: নাগরিকদের কঠোর সতর্কবার্তা পাকিস্তানি দূতাবাসের

সৌদি আরবে পবিত্র হজ ও ওমরাহ পালন করতে গিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি, অননুমোদিত অর্থ সংগ্রহ এবং ভিসার শর্ত লঙ্ঘন না করতে নিজ দেশের নাগরিকদের কঠোরভাবে...

কোরবানপুরে মাদকবিরোধী র‍্যালি ও সমাবেশ

‘চলো যাই যুদ্ধে, মাদকের বিরুদ্ধে’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে কুমিল্লার বাঙ্গরা বাজার থানার কোরবানপুরে মাদকবিরোধী র‍্যালি ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। রোববার (১৭ আগস্ট) বিকেলে...

Related Articles

পাঁচ দিনের যমজ নবজাতক রেখে মায়ের চলে যাওয়ার অভিযোগ : চরম বিপাকে পরিবার

মাত্র পাঁচ দিনের দুই যমজ কন্যাশিশু। পরম মমতা ও স্নেহে মায়ের কোলে...

সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আমন্ত্রণ পাননি বহিষ্কৃত সংসদ সদস্য গাজী নজরুল

সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকে আমন্ত্রণ পাননি বহিষ্কৃত দলীয় নেতা ও সাতক্ষীরা-৪...

দীপু মনির প্যারোলে মুক্তির আবেদনের পর স্বামীর জানাজা ও দাফনের সিদ্ধান্ত

মুন্সীগঞ্জ কারাগারে বন্দি সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির প্যারোলে মুক্তির অনুমতি পাওয়ার...

খাসির মাংস না পেয়ে বিয়ের আসর ত্যাগ করা সেই প্রবাসীর বিয়ে সম্পন্ন

ঐতিহ্যবাহী ‘খদর’-এ খাসির মাংস না থাকায় বিয়ের আসর ছেড়ে চলে গিয়ে দেশজুড়ে...