Home আন্তর্জাতিক জেন–জি ভোটারদের টানতে ইনস্টাগ্রাম রিলে ভরসা মোদি–বিজেপির
আন্তর্জাতিক

জেন–জি ভোটারদের টানতে ইনস্টাগ্রাম রিলে ভরসা মোদি–বিজেপির

Share
Share

চাকরি ও শিক্ষার সুযোগের সংকট নিয়ে ভারতের তরুণদের ক্ষোভ রাজপথে গড়ানোর পর এবার তাদের মন জয় করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন কৌশল নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তাঁর দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এখন বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে ইনস্টাগ্রাম রিল ও স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিওতে। মোদির প্রচারের ধরনেও এসেছে বড় পরিবর্তন। কঠোরভাবে প্রস্তুত রাজনৈতিক বার্তার বদলে গুরুত্ব পাচ্ছে স্বাভাবিক, হালকা ও তুলনামূলক কম সম্পাদিত ভিডিও।

সাম্প্রতিক ভিডিওগুলোতে মোদিকে আগের তুলনায় অনেক বেশি স্বতঃস্ফূর্ত ভঙ্গিতে দেখা যাচ্ছে। কোনো ভিডিওতে তিনি বাইক জ্যাকেট ও সানগ্লাস পরে আছেন, পেছনে বাজছে র‌্যাপ সংগীত। আবার কোনো ভিডিওতে জনপ্রিয় সিটকম ফ্রেন্ডস–এর থিম সং ব্যবহার করে তাঁকে নির্ভরযোগ্য নেতা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

গত ৩১ জুলাই প্রকাশিত একটি ভিডিওতে মোদিকে আরও অনানুষ্ঠানিক ভঙ্গিতে দেখা যায়। উল্লম্বভাবে ধারণ করা ওই ভিডিওতে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, ‘হাই, ফ্রেন্ডস।’

এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে গত মাসের জেন–জি বিক্ষোভ। চাকরি ও শিক্ষার সুযোগের সংকট নিয়ে ভারতের হাজারো শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থী রাজপথে নামেন। একটি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিক্ষোভ পরে বড় আকার ধারণ করে। এর পর দেশটির শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করেন।

ভারতে সরকারি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাকে পেশাজীবনে প্রবেশ এবং ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়। ফলে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় তরুণদের ক্ষোভ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আর সেই ক্ষোভ ছড়িয়ে দেওয়ার অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল ইনস্টাগ্রাম রিল ও স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও।

রাজপথের আন্দোলন থেকে ইনস্টাগ্রামের লড়াই

বিক্ষোভকারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন সব ভিডিও প্রকাশ করেন, যা মোদির দীর্ঘদিনের গড়ে তোলা ‘রাজনৈতিকভাবে অপ্রতিরোধ্য’ নেতার ভাবমূর্তিকে চ্যালেঞ্জ জানায়। একই সঙ্গে সরকারের রাজনৈতিক বার্তার ওপর নিয়ন্ত্রণের ধারণাও প্রশ্নের মুখে পড়ে।

বিশ্লেষকদের মতে, এখানেই বিজেপির পুরোনো ডিজিটাল প্রচারের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বিজেপি ডিজিটাল যোগাযোগকে রাজনৈতিক প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। টেলিভিশনের পাশাপাশি হোয়াটসঅ্যাপ ও এক্সের মতো প্ল্যাটফর্মে দলটি শক্তিশালী যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।

তবে ইনস্টাগ্রামের দর্শক, বিশেষ করে তরুণদের বড় একটি অংশ, একই ধরনের রাজনৈতিক প্রচারে আগ্রহী নয়।

দিল্লিভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক আসিম আলী বলেন, এসব প্ল্যাটফর্মে কোটি কোটি অনুসারীর কাছে ওপর থেকে নিয়ন্ত্রিত ও আগে থেকেই প্রস্তুত রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু ইনস্টাগ্রামে সফল হতে হলে শুধু বার্তা দিলেই হয় না; প্ল্যাটফর্মটির নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়।

তাঁর মতে, ইনস্টাগ্রাম স্বতঃস্ফূর্ততা, রসিকতা ও অকৃত্রিমতাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। অতিরিক্ত পরিকল্পিত রাজনৈতিক বার্তা সেখানে সহজেই কৃত্রিম মনে হতে পারে।

মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনফরমেশন স্কুলের অধ্যাপক জোয়োজিত পালের ভাষ্যও প্রায় একই। তাঁর মতে, কোনো কনটেন্ট অতিরিক্ত সাজানো, প্রতিটি শব্দ মেপে বলা কিংবা উপস্থাপনা ও পটভূমি অতিরিক্ত পরিকল্পিত মনে হলে তা তরুণদের কাছে কম আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।

মোদির ভিডিও, মন্ত্রীদেরও রিল

মোদির নতুন ধরনের ভিডিও প্রচার এখন শুধু তাঁর ব্যক্তিগত প্রচারে সীমাবদ্ধ নেই। তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্য এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরও একই কৌশল অনুসরণ করছে।

গত ১০ দিনে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি দপ্তর থেকে একের পর এক ছোট ও তুলনামূলক কম সম্পাদিত ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, তারা স্ন্যাপচ্যাটে সক্রিয় হওয়ার পরিকল্পনা করছে।

বিজেপির এক মন্ত্রীর যোগাযোগ দলের একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আগে এক্স বা ফেসবুকের জন্য তৈরি স্থির পোস্টে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো। এখন বেশি রিল তৈরির নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। ভিডিওতে সম্পাদনা কম রাখা এবং কিছুটা ‘কাঁচাভাব’ বজায় রাখার ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে।

অর্থাৎ, এত দিন নিখুঁতভাবে সাজানো চিত্র ও নিয়ন্ত্রিত বার্তার ওপর নির্ভর করা রাজনৈতিক প্রচার এখন তরুণদের কাছে পৌঁছাতে ইচ্ছাকৃতভাবে আরও স্বাভাবিক ও অনানুষ্ঠানিক রূপ নিচ্ছে।

সামনে ২০২৯, লক্ষ্য ৪০ কোটির বেশি তরুণ ভোটার

এই পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচন।

ভারতের ১৪০ কোটির বেশি মানুষের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি ৩৫ বছরের নিচে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৯ সালের নির্বাচনে জেন–জি দেশটির সবচেয়ে বড় ভোটার গোষ্ঠীগুলোর একটিতে পরিণত হবে।

ফলে এই প্রজন্মের ভোট মোদির রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তাদের সমর্থন পেলে তিনি টানা চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।

এ কারণেই বিজেপি এখন ৪০ কোটির বেশি জেন–জি ভোটারের কাছে পৌঁছানোর কৌশল নিয়েছে।

তবে বিজেপির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমবিষয়ক প্রধান অমিত মালব্য এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। দলের চারজন জাতীয় মুখপাত্রের কাছেও এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলেও তাঁরা কোনো জবাব দেননি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বাইরেও তরুণদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে বিজেপি। বৃহস্পতিবার ভারতের আর্থিক রাজধানী মুম্বাইয়ে প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থীর সামনে বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে বিজেপির আদর্শিক সহযোগী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) প্রধান মোহন ভাগবতের।

বিক্ষোভের পর মন্ত্রীদের নির্দেশ

বিক্ষোভের পর অনুষ্ঠিত এক মন্ত্রিসভা বৈঠকে মোদি তাঁর মন্ত্রীদের তরুণদের জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে ভিডিওগুলোকে আগের তুলনায় কম পরিপাটি রাখার ওপর জোর দেন।

এরপর থেকেই মন্ত্রী ও সরকারি দপ্তরের ভিডিওতে সেই পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

‘আমি জেন–জি’ পোস্টারেও মোদির নাম

তরুণদের মন জয়ের প্রচারের আরেকটি দিক দেখা যাচ্ছে মুম্বাইয়ের রাস্তায়। সেখানে ‘আমি জেন–জি’ লেখা পোস্টার টানানো হয়েছে।

এসব পোস্টারে জেন–জির নামে বিভিন্ন অঙ্গীকার তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে পুলিশ, সেনাবাহিনী ও প্রধানমন্ত্রী মোদিকে সম্মান করার প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সমর্থনের কথাও রয়েছে।

তবে এই প্রচার কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকেরা।

লেখক ও পডকাস্টার অনুরাগ মিনাস ভার্মা বলেন, ইন্টারনেটের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি রয়েছে। গুরুগম্ভীর রাজনৈতিক বার্তাকে রিলের আকারে প্রকাশ করলেও তা সহজেই ট্রলের শিকার হতে পারে।

তাঁর ভাষায়, বিজেপির প্রচারে ইনস্টাগ্রামের গুরুত্ব বাড়বে ঠিকই, কিন্তু জেন–জি শেষ পর্যন্ত এই প্রচার গ্রহণ করবে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।

তরুণদের ক্ষোভ বুঝে কি বদলাচ্ছেন মোদি?

জেন–জি বিক্ষোভ ভারতের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে—চাকরি, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তরুণদের অসন্তোষ শুধু প্রচলিত রাজনৈতিক প্রচার দিয়ে সামাল দেওয়া কঠিন।

রাজপথে বিক্ষোভকারীরা যে রিল ও স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও দিয়ে নিজেদের বক্তব্য ছড়িয়ে দিয়েছেন, এবার সেই একই মাধ্যমেই তরুণ ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে চাইছেন মোদি ও বিজেপি।

তাই বাইক জ্যাকেট, সানগ্লাস, র‌্যাপ সংগীত কিংবা ‘হাই, ফ্রেন্ডস’—এসব শুধু ভিডিওর উপস্থাপনা নয়; ২০২৯ সালের নির্বাচনের আগে ভারতের তরুণ ভোটারদের সঙ্গে নতুন করে যোগাযোগ গড়ে তোলার রাজনৈতিক কৌশলের অংশ।

তবে এই কৌশল শেষ পর্যন্ত তরুণ ভোটারদের কতটা আকৃষ্ট করবে, নাকি উল্টো ট্রল ও সমালোচনার মুখে পড়বে—সেটিই এখন মোদি ও বিজেপির সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

এএম

যদি এটি পত্রিকায় প্রকাশের জন্য হয়, তাহলে এটিকে আরও সংক্ষিপ্ত করে ৮০০–১,০০০ শব্দের প্রথম আলোর নিউজ ফিচার ফরম্যাটেও সাজিয়ে দিতে পারি।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Don't Miss

চার বিভাগে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস, চট্টগ্রামে ভূমিধসের আশঙ্কা

  সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে দেশের চারটি বিভাগে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর। একই সঙ্গে অতিবৃষ্টির...

পপুলার ডায়াগনস্টিকে অভিযান: সরকারি চিকিৎসকের লাইসেন্স বাতিল ও বরখাস্তের নির্দেশ

  রাজধানীর পুরান ঢাকার ইংলিশ রোডে পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অভিযান চালিয়ে সরকারি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় বেসরকারিভাবে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার অভিযোগে এক চিকিৎসকের লাইসেন্স বাতিল...

Related Articles

পাকিস্তানে বিদেশি সাংবাদিকদের ওপর নতুন বিধিনিষেধ, স্বাধীন গণমাধ্যম নিয়ে উদ্বেগ

দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকদের ওপর নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করেছে পাকিস্তান সরকার। একই...

চোর বলে সম্বোধনের জেরে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা কূটনৈতিক সম্পর্কে ফাটল

  আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইর মন্তব্যকে কেন্দ্র করে দেশটির সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের...

গোলাবারুদের ঘাটতির খবর ফাঁসকারীদের কারাদণ্ডের হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের

  যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদের কোনো ঘাটতি নেই বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড...

লেবাননে সংঘাতের মুখে ২ ইসরায়েলি সেনা নিহত, যুক্তরাষ্ট্রে মার্কিন মিসাইলের তীব্র ঘাটতি

দক্ষিণ লেবাননে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর (আইডিএফ) দুই সদস্য নিহত এবং...