Home সাম্প্রতিক হামলার মধ্যেও ৩ নবজাতককে যেভাবে বাঁচালেন ইরানি নার্স
সাম্প্রতিক

হামলার মধ্যেও ৩ নবজাতককে যেভাবে বাঁচালেন ইরানি নার্স

Share
Share

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় কেঁপে উঠছিল তেহরানের খাতাম আল-আনবিয়া হাসপাতাল। চারদিকে ধোঁয়া আর আতঙ্কে ছুটোছুটি করছিল মানুষ। সেই ভয়াবহ মুহূর্তে নিজের জীবনের কথা না ভেবে ৩ নবজাতককে বুকে জড়িয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যান ইরানি নার্স নেদা সালিমি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে ছড়িয়ে পড়া সেই ভিডিও এখন সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

গত ১ মার্চ সকাল ১১টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালের পাশের একটি সামরিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের বোমা হামলায় প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের অভিঘাতে হাসপাতালের জানালার কাচ ভেতরে ঢুকে পড়ে, ছাদের অংশ ভেঙে পড়ে ধুলার মেঘ তৈরি হয়। আতঙ্কিত রোগীরা ধোঁয়াভরা করিডোর দিয়ে দৌড়ে পালাতে থাকেন।

হাসপাতালের পঞ্চম তলার নবজাতক ওয়ার্ডে তখন তিনটি শিশু শুয়ে ছিল। জন্মের মাত্র কয়েক ঘণ্টা পেরিয়েছে তাদের। বিস্ফোরণের মুহূর্তে শিশুদের পাশেই বসে প্রতিবেদন লিখছিলেন নার্স নেদা সালিমি।

তিনি বলেন, ভাবার সময় ছিল না। মাথায় শুধু একটাই চিন্তা ছিল শিশুগুলোকে নিরাপদ জায়গায় নিতে হবে।

নিরাপত্তা ক্যামেরার ভিডিওতে দেখা যায়, বিস্ফোরণের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তিন নবজাতককে বুকে তুলে নিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন তিনি। চারদিকে তখন ধ্বংসাবশেষ ঝরছে।

সাত সেকেন্ডের সেই ভিডিও দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তবে ভিডিওতে ধরা পড়েনি পরের পরিস্থিতি। করিডোরে পৌঁছে দুই নবজাতককে সহকর্মীদের হাতে তুলে দেন তিনি। আরেক শিশুকে বুকে চেপে ধরে হাসপাতালের আশ্রয়কেন্দ্রের দিকে ছুটতে থাকেন।

নেদা বলেন, আমরা শিশুদের পুরো সময় কোলে রেখেছিলাম, যাতে তারা আঘাত না পায়। আশ্রয়কেন্দ্রে তখন শুধু ভয় আর মানুষের একে অন্যকে সাহায্য করার চেষ্টা।

তিন শিশুর মধ্যে দুইজন ছেলে ও একজন মেয়ে। হামলার এক ঘণ্টারও কম সময় আগে তাদের জন্ম হয়েছিল। অস্ত্রোপচারের পর মায়েরা তখনো শয্যায়। বিস্ফোরণের পর অনেকে ভেবেছিলেন, তাদের সন্তান হয়তো বেঁচে নেই।

নেদা বলেন, অবশেষে যখন মায়েদের খুঁজে পেলাম এবং শিশুদের তাদের হাতে ফিরিয়ে দিলাম, সেটাই ছিল সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত। কয়েক মিনিটের জন্য আমরা ভুলেই গিয়েছিলাম যে বাইরে যুদ্ধ চলছে।

৩৬ বছর বয়সী নেদা সালিমি কেরমানশাহর বাসিন্দা। ইরান ইউনিভার্সিটি অব মেডিকেল সায়েন্সেসে নার্সিংয়ে পিএইচডির শেষ সেমিস্টারে পড়ছেন তিনি। প্রায় ১২ বছর ধরে নার্স হিসেবে কাজ করছেন। শিশু ও নবজাতক পরিচর্যায় রয়েছে এক দশকের অভিজ্ঞতা। তিনি এক ছয় বছর বয়সী সন্তানের মা।

তিনি বলেন, নবজাতকদের সঙ্গে প্রতিদিন কাজ করতে করতে তাদের প্রতি এক ধরনের দায়িত্ববোধ তৈরি হয়। মা হওয়ায় সেই অনুভূতি আরও গভীর হয়েছে।

নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে কাজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে নেদা বলেন, এক মুহূর্তে হয়তো কোনো শিশুকে বাঁচানো যায় না, আর কিছুক্ষণ পর আরেক মাকে হাসিমুখে বুকের দুধ খাওয়ানোর পরামর্শ দিতে হয়। এখানে শোক আর আশার মধ্যে প্রতিনিয়ত চলাফেরা করতে হয় আমাদের।

যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যেও হাসপাতালের কর্মীরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। মার্চের হামলার আগে ২০২৫ সালের জুনের ১২ দিনের যুদ্ধেও নবজাতকদের সরিয়ে নেওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছিল নেদার।

তিনি বলেন, আশ্রয়কেন্দ্রে বসে আমি আল্লাহর কাছে কয়েক মিনিট সময় চেয়েছিলাম। শুধু এতটুকু, যাতে শিশুদের মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিতে পারি। এরপর যদি মৃত্যু আসে, তাতেও আপত্তি ছিল না।

ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর রাতারাতি আলোচনায় চলে আসেন নেদা। প্রতিবেশীরা বাড়িতে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছেন। হাসপাতালেও ফোনের পর ফোন এসেছে।

তবে নেদা মনে করেন, এটি কোনো একার সাহসিকতা নয়। সেদিন আমার সব সহকর্মী সাহসিকতার সঙ্গে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

এখনও তিনি তিন শিশুর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। তার জানা মতে, তিনজনই সুস্থ আছে। নেদা বলেন, এটাই আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ। তিনটি ছোট হৃদস্পন্দন এখনও চলছে।

যুদ্ধের পরও নার্সদের ওপর মানসিক চাপ ও সংকট রয়ে গেছে বলে জানান তিনি। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, জনবল সংকট, অর্থনৈতিক চাপ এবং যুদ্ধের মানসিক ক্ষত বয়ে বেড়াতে হচ্ছে তাদের।

নেদা বলেন, যখন চারদিকে বোমা পড়ে আর কেউ আপনাকে বাঁচাতে আসে না, তখন মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে আশার আলো জ্বালানোই আসল দায়িত্ব। একজন ভালো নার্সের শুধু দক্ষতা নয়, মানবিক হৃদয়ও থাকতে হয়।

ভবিষ্যতে বড় হয়ে যদি সেই শিশুরা একদিন জানতে পারে জন্মের প্রথম ঘণ্টায় কী ঘটেছিল। তিনি চান তারা বুঝুক, তাদের জীবন এক অলৌকিক উপহার।

মৃদু হাসি দিয়ে নেদা বলেন, আমি চাই তারা শক্ত ও মানবিক মানুষ হয়ে উঠুক। তাহলেই মনে হবে, সবকিছু সার্থক ছিল।

সূত্র : প্রেস টিভি

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Don't Miss

বিশ্বকাপের এই আসরে সর্বোচ্চ এসিস্ট ব্রুনো গিমারায়েসের

গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লির জয়সূচক গোলের পেছনে বড় ভূমিকা ছিল ব্রুনো গিমারায়েসের। যোগ করা সময়ের শেষ দিকে জাপানের রক্ষণভাগের চাপ সামলে নিখুঁত এক থ্রু পাস...

জামিন পেলেন কণ্ঠশিল্পী সাবেক এমপি মমতাজ

  দুই হত্যা ও একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য ও কণ্ঠশিল্পী মমতাজ বেগমকে জামিন দিয়েছেন হাইকোর্ট। সোমবার তাঁর করা আবেদনের ওপর চূড়ান্ত...

Related Articles

রামেক হাসপাতালে যুক্ত হলো আধুনিক ‘বায়োফায়ার ফিল্মঅ্যারে’ মেশিন

মো. গোলাম কিবরিয়া, রাজশাহী রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন গুরুতর রোগীদের...

আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল নিয়ে পড়ে থাকলে পেটে ভাত আসবে না: তরুণদের উদ্দেশে মির্জা ফখরুল

শুধু আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের ফুটবল সমর্থন নিয়ে মেতে না থেকে উদ্ভাবন, গবেষণা ও প্রযুক্তিনির্ভর...

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় অংশ নিতে ইরানের পথে স্পিকার

ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় অংশ নিতে দেশটির উদ্দেশে...

অফিসে বেঁচে যাওয়া চা-বিস্কুট নেওয়ায় ১৭ বছরের চাকরি হারালেন পিয়ন

ভারতের ঝাড়খণ্ডে অফিস থেকে চা-পাতা ও বিস্কুট বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগে বরখাস্ত...