ম.ম.রবি রবি ডাকুয়াঃ
সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ কেওড়া শুধু উপকূল রক্ষা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে না, এর ফলকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের খাদ্যসংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও তৈরি হচ্ছে নতুন সম্ভাবনা।
সুন্দরবনের নদী-খাল ও লবণাক্ত চরাঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো কেওড়া গাছ উপকূলীয় পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর বৈজ্ঞানিক নাম Sonneratia apetala। বর্ষা মৌসুমে এ গাছে প্রচুর ফল ধরে। স্থানীয় মানুষের কাছে কেওড়া ফল দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত খাদ্য উপাদান। পাশাপাশি মৌসুমি এই ফল সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করে কেউ কেউ আয়ও করছেন।
খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় কেওড়া গাছের দেখা মেলে। লবণাক্ত পরিবেশে টিকে থাকার সক্ষমতার কারণে উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রে গাছটির গুরুত্ব রয়েছে। স্থানীয়ভাবে কেওড়া ফল চাটনি, আচারসহ বিভিন্ন খাবার তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। ছোট চিংড়ি মাছ ও মসুর ডালের সঙ্গে কেওড়া ফলের রান্নাও উপকূলীয় অঞ্চলের পরিচিত খাদ্যসংস্কৃতির অংশ।
কেওড়া ফলকে কেন্দ্র করে কিছু এলাকায় ক্ষুদ্র পরিসরে প্রক্রিয়াজাত পণ্য তৈরির উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে। স্থানীয় নারীরা মৌসুমে কেওড়া সংগ্রহ করে আচার ও চাটনি তৈরি করছেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এসব পণ্যের মানসম্মত প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং ও বাজারজাত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে উপকূলীয় নারীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে কেওড়া ফলের বাণিজ্যিক ব্যবহার এখনো সীমিত। উদ্যোক্তাদের জন্য মান নিয়ন্ত্রণ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও আধুনিক প্যাকেজিংয়ের সুযোগের অভাব বড় বাধা। এসব ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়া গেলে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কেওড়া পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।
কেওড়া ফলের পুষ্টিগুণ নিয়েও গবেষণা হয়েছে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শেখ জুলফিকার হোসেনের গবেষণায় কেওড়া ফলে ভিটামিন সি, পলিফেনল, ফ্ল্যাভোনয়েড ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসহ বিভিন্ন উপাদানের উপস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এসব উপাদানের কারণে মানুষের ওপর কী ধরনের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যগত প্রভাব পড়ে, তা নিশ্চিতভাবে জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
কেওড়া গাছ সুন্দরবনের খাদ্যশৃঙ্খলেও ভূমিকা রাখে। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এর ফল বিভিন্ন বন্যপ্রাণী ও পাখির খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কেওড়ার ফুলে মৌমাছির বিচরণ থাকায় সুন্দরবনের মধু উৎপাদনের সঙ্গেও গাছটির সম্পর্ক রয়েছে।
পরিবেশগত দিক থেকেও কেওড়া গুরুত্বপূর্ণ। লবণাক্ত উপকূলীয় পরিবেশে বেড়ে ওঠা এই ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ উপকূলীয় ভূমি ও বাস্তুতন্ত্রের স্থিতিশীলতায় ভূমিকা রাখে। ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের প্রভাব কমানো এবং নদীতীর ও চরাঞ্চলের ভূমি ধরে রাখার ক্ষেত্রেও ম্যানগ্রোভ বন গুরুত্বপূর্ণ।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ায় অনেক এলাকায় প্রচলিত কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো কেওড়াসহ বিভিন্ন লবণসহিষ্ণু উদ্ভিদের সংরক্ষণ ও পরিকল্পিত বনায়ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেওড়ার পরিবেশগত গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে অবৈধভাবে গাছ কাটা বন্ধ, প্রাকৃতিক বন সংরক্ষণ এবং পরিকল্পিত বনায়ন জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ফল সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে টেকসই পদ্ধতি নিশ্চিত করতে হবে।
পরিকল্পিতভাবে কেওড়া সংরক্ষণ ও এর ফলের বহুমুখী ব্যবহার বাড়ানো গেলে একদিকে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় ভূমিকা রাখা সম্ভব, অন্যদিকে উপকূলের মানুষের জন্য তৈরি হতে পারে অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ। তবে এর বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের আগে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
Leave a comment