নিজস্ব প্রতিবেদক, সিলেট
‘অপরাধী ধরার পর আইনের ফাঁকফোকড় দিয়ে দ্রুত জামিনে বের হয়ে যায়। বের হয়েই তারা একই অপরাধে জড়ায়। পুলিশ একটি অপরাধীকে ধরতে যত সময় লাগে, তার চেয়েও কম সময়ে তারা জেল থেকে বের হয়ে আসে। তাদের পেছনে কারা আছে? কীভাবে এত অল্প সময়ে জামিন পায়? আজ গ্রেফতার করলে কাল এসে পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে হাসে।’
সিলেট মহানগরের হালনাগাদ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও পুলিশের কার্যক্রম নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এমন আক্ষেপের কথা বলেন সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী, পিপিএম।
তবে এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন কৌশল নিয়েছে পুলিশ। মাদককে সব অপরাধের সূতিকাগার হিসেবে চিহ্নিত করে ‘চিরুণী অভিযান’ শুরু করেছে এসএমপি। এ অভিযানে নিয়মিত মামলা নয়, বরং ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন’ কৌশলে মাদকসেবী ও কারবারিদের ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হচ্ছে। পুলিশের এই উদ্যোগ নগরবাসীর প্রশংসা পাচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত কয়েক মাস ধরে সিলেটে চুরি, ছিনতাইসহ নানা অপরাধ বেড়ে যায়। অপরাধ দমনে পুলিশ জোরালো অভিযান চালালেও গ্রেফতারের পর দ্রুত জামিনে বের হয়ে আবার অপরাধে জড়ানোর প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। তথ্যানুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব অপরাধীর অধিকাংশই মাদকাসক্ত। মাদকের টাকার জন্যই তারা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কয়েকটি ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গেও মাদকাসক্তদের সম্পৃক্ততা পেয়েছে পুলিশ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত মে মাসে বিশেষ অভিযান চালিয়ে এক হাজার ৬৬৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়। চলতি বছরের আগের মাসগুলোতেও গ্রেফতারের সংখ্যা প্রায় একই ছিল। তবু অপরাধ নিয়ন্ত্রণে না আসায় মাদক নির্মূলকে অগ্রাধিকার দিয়ে নতুন ‘অ্যাকশন প্ল্যান’ নিয়েছে এসএমপি।
এর অংশ হিসেবে গত শনিবার রাত থেকে ‘চিরুণী অভিযান’ নামে ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন’ শুরু হয়েছে। জেলা প্রশাসনের একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পরিচালিত এ অভিযানে মাদকসেবী ও কারবারিদের আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দেওয়া হচ্ছে।
বুধবার (১০ জুন) সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা থেকে রাত সাড়ে দশটা পর্যন্ত মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১৫৪ জনকে দণ্ড দেওয়া হয়। এর মধ্যে কোতোয়ালি থানা এলাকায় ৩৪ জন, জালালাবাদে ২১ জন, এয়ারপোর্টে ২৬ জন, দক্ষিণ সুরমায় ২৭ জন, মোগলাবাজারে ১৯ জন এবং শাহপরাণ থানা এলাকায় ২৭ জন রয়েছেন।
এর আগে সোমবার (৮ জুন) সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা থেকে রাত সাড়ে দশটা পর্যন্ত এবং মঙ্গলবার (৯ জুন) সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা থেকে রাত সাড়ে বারোটা পর্যন্ত পৃথক অভিযানে ১১০ জনকে আটক করা হয়। তাঁদের ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে কোতোয়ালি মডেল থানায় ২৪ জন, জালালাবাদে ১৪ জন, এয়ারপোর্টে ২৩ জন, দক্ষিণ সুরমায় ২১ জন, মোগলাবাজারে ৬ জন এবং শাহপরাণ থানা এলাকায় ২২ জন রয়েছেন।
গত শনিবার (৬ জুন) সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা থেকে চার ঘণ্টার অভিযানে মাদকসেবী ও কারবারিসহ ১৩৯ জনকে আটক করে সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। পুলিশের এই ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন’ শুরুর পর মাদক কারবারিদের মধ্যে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
এসএমপি কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী বলেন, আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে মাদকের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অভিযান শুরু হয়েছে। মাদক ও অপরাধমুক্ত মহানগর গড়ে না তোলা পর্যন্ত এই অভিযান চলবে। তবে এ কাজে পুলিশের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সহযোগিতাও জরুরি।
তিনি আরও বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা বাড়াতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্যাম্পেইন, অভিভাবক সমাবেশ এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে আলোচনা সভার আয়োজন করা হবে। পাশাপাশি অপরাধপ্রবণ এলাকায় নজরদারি জোরদার, মাদকের হটস্পট চিহ্নিতকরণ এবং কিশোর গ্যাং দমনে বিশেষ কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
Leave a comment