মোহাম্মদ রাহবার ইসলাম তুর্য্য, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়
আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের চেতনা, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের উদ্যাপন ও পারস্পরিক সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ় করার প্রত্যয়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে (খুবি) অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘সম্প্রীতির সুর’ শীর্ষক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বিশ্ববিদ্যালয়ের আদিবাসী শিক্ষার্থীদের আয়োজনে এ অনুষ্ঠানে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর গান, নাচ ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের নানা দিক তুলে ধরা হয়। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের পাশাপাশি গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আদিবাসী শিক্ষার্থীদের সংগঠন এবং নেপালি অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যরাও এতে অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বিষয়ক পরিচালক ড. মো. সালাউদ্দিন বলেন, বাংলাদেশের আয়তন তুলনামূলক ছোট হলেও এ দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ। বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনযাপনের বৈচিত্র্য সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমাদের যতটুকু বৈচিত্র্য আছে, আমাদের যতখানি বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য আছে, সেই বৈচিত্র্য আমরা ধরে রাখার চেষ্টা করব এবং এটাকেই আমাদের সম্প্রীতির একটা সেতুবন্ধন হিসেবে ধারণ করব।’
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গেলে তাঁরা সেখানকার সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাবেন। বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের সহাবস্থানের উদাহরণ তুলে ধরে নিজেদের দেশের বৈচিত্র্য উপভোগ ও সংরক্ষণের আহ্বান জানান তিনি।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আদিবাসী শিক্ষার্থী সংগঠনের সভাপতি উইনুপ্রু চৌধুরী বলেন, নিজেদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দিতে সংগঠনটি প্রতিবছর ‘সম্প্রীতির সুর’ আয়োজন করে। আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসকে কেন্দ্র করে এবারের আয়োজনও সেই ধারাবাহিকতার অংশ।
আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ও ‘আদিবাসী’ শব্দের ব্যবহার নিয়ে বিতর্কের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন উইনুপ্রু চৌধুরী। তিনি বলেন, সরকারি বিভিন্ন নথি ও প্রতিষ্ঠানের নামেও অতীতে ‘আদিবাসী’ শব্দের ব্যবহার দেখা গেছে। ২০০৭ সালে জাতিসংঘের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকারবিষয়ক ঘোষণাপত্র গ্রহণের সময় বাংলাদেশের স্বাক্ষর না করার বিষয়টিও উল্লেখ করেন তিনি।
পার্বত্য চট্টগ্রাম ও ভূমির অধিকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, উন্নয়ন ও পর্যটনের নামে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ভূমি ও বসতি নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। সাজেকের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, পর্যটনকেন্দ্র গড়ে ওঠার আগে ওই এলাকায় লুসাই, পাংখুয়া ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস ছিল। উন্নয়নের নামে তাঁদের ভূমি থেকে বেদখল বা বিতাড়নের অভিযোগ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
উইনুপ্রু চৌধুরী আরও বলেন, নিজেদের অধিকার ও পরিচয় নিয়ে কথা বলাকে অনেক সময় বিচ্ছিন্নতাবাদ বা রাষ্ট্রবিরোধিতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। তবে তাঁদের লক্ষ্য বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া নয়; বরং বাংলাদেশের ভেতরেই নিজেদের অধিকার, পরিচয় ও মর্যাদা নিয়ে সবার সঙ্গে বসবাস করা।
তিনি বলেন, ‘আমরা একত্র হয়ে থাকতে চাই। আর সম্প্রীতির সুর কেন করি? যাতে আমরা ক্যাম্পাসের সবাই মিলেমিশে একসঙ্গে থাকি। আমরা চাই সবাই একতাবদ্ধ হয়ে এই বাংলাদেশে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকতে।’
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনের অংশগ্রহণ ও সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানান তিনি। পারস্পরিক সহযোগিতা ও অংশগ্রহণের মাধ্যমে ক্যাম্পাসে সম্প্রীতির পরিবেশ আরও শক্তিশালী হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন।
পরে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী গান, নৃত্য ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে ক্যাম্পাসে তৈরি হয় বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক আবহ।
Leave a comment