ইরাক থেকে নিজেদের সমস্ত সামরিক ঘাঁটি গুটিয়ে নিয়ে দীর্ঘ দুই দশকের ঐতিহাসিক উপস্থিতির চূড়ান্ত অবসান ঘটাল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দেশটিতে থাকা অবশিষ্ট সমস্ত সৈন্য ও সামরিক সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়ার জটিল প্রক্রিয়াটি সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, হঠাৎ করে মার্কিন বাহিনীর এই পূর্ণাঙ্গ বিদায়ে ইরাকের ভূরাজনৈতিক অঙ্গনে এক গভীর নিরাপত্তা শূন্যতা তৈরি হওয়ার প্রবল আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সুযোগে অঞ্চলটিতে সক্রিয় ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো তাদের অবস্থান আরও শক্ত করতে পারে এবং একই সাথে চরমপন্থী সন্ত্রাসী সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) নতুন করে সংগঠিত হওয়ার সুবর্ণ সুযোগ পেতে পারে। স্বভাবতই তেহরান ও তাদের আঞ্চলিক মিত্ররা মার্কিন বাহিনীর এই বিদায়কে নিজেদের বড় ধরনের রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিজয় হিসেবেই দেখছে। ২০২৪ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলে সমঝোতার ভিত্তিতে চুক্তিটি হলেও, বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন চলমান আঞ্চলিক উত্তেজনার আবহেই চূড়ান্তভাবে সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়ন করল।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০০৩ সালে এক রক্তক্ষয়ী সামরিক অভিযানের মাধ্যমে সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করার মধ্য দিয়ে ইরাকে মার্কিন সাম্রাজ্যের সরাসরি হস্তক্ষেপ শুরু হয়। ২০১১ সালে প্রথম দফায় যুক্তরাষ্ট্র সেনা প্রত্যাহার করলেও পরবর্তীতে উগ্রপন্থী গোষ্ঠী আইএসের ব্যাপক উত্থানের মুখে ২০১৪ সালে পুনরায় মার্কিন বাহিনীকে ইরাকে ফিরতে হয়। দীর্ঘ এই ২১ বছরের সামরিক উপস্থিতিতে আফগানিস্তান যুদ্ধের চেয়েও দ্বিগুণের বেশি প্রাণহানি ঘটেছে মার্কিন বাহিনীর—সব মিলিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৪ হাজার ৫০০ জন আমেরিকান সেনা। এমনকি চলতি বছরেই মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতময় পরিস্থিতিতে ইরাকে থাকা সাতজন মার্কিন সেনা সদস্য প্রাণ হারান, যার সর্বশেষ শিকার গত জুলাইয়ে এরবিলের সামরিক ঘাঁটিতে এক ড্রোন হামলায় নিহত মার্কিন সার্জেন্ট।
সাধারণ ইরাকিদের কাছে দীর্ঘদিনের বিদেশি শাসনের অবসান স্বস্তিদায়ক হলেও, নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মন থেকে উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি। মার্কিন অর্থায়ন ও প্রশিক্ষণপুষ্ট স্থানীয় বাহিনী এককভাবে দেশটির সার্বভৌমত্ব ও আইনশৃঙ্খলা কতটা অক্ষুণ্ণ রাখতে পারবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে চরম সংশয় রয়েছে। কারণ দুই দশকের ইতিহাস প্রমাণ করেছে, এই অঞ্চলে সৃষ্টি হওয়া যেকোনো আকস্মিক ক্ষমতার শূন্যতা চরম বিপজ্জনক রূপ ধারণ করতে সময় নেয় না।
Leave a comment