মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতময় পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি আবারও চরম উদ্বেগের মুখে পড়েছে। লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে ইসরাইলি বাহিনীর বিমান হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন আল-আখবার পত্রিকার প্রখ্যাত সাংবাদিক আমাল খলিল। বুধবার (২২ এপ্রিল) তাইরি শহরে এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে।
লেবাননের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা (এনএনএ) এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সাংবাদিক আমাল খলিল যুদ্ধের ধ্বংসলীলার সংবাদ সংগ্রহ করতে দক্ষিণাঞ্চলীয় তাইরি শহরে অবস্থান করছিলেন। প্রথম দফার হামলার পর জীবন বাঁচাতে তিনি এবং তার সহকর্মীরা পাশের একটি আবাসিক ভবনে আশ্রয় নেন। দুর্ভাগ্যবশত, ইসরাইলি সামরিক বাহিনী পরবর্তী লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ওই ভবনটিকেই বেছে নেয়।
হামলার তীব্রতায় ভবনটি ধসে পড়লে আমাল খলিল ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েন। তাকে উদ্ধারের জন্য এগিয়ে আসেন সহকর্মী জয়নাব ফারাজ। কিন্তু উদ্ধার তৎপরতা চলাকালীন দ্বিতীয় দফার হামলায় জয়নাব ফারাজও গুরুতর আহত হন। লেবানন রেড ক্রসের কর্মীরা চরম ঝুঁকি নিয়ে তাকে উদ্ধার করে তিবনিন হাসপাতালে ভর্তি করেন। বর্তমানে তার অবস্থা সংকটাপন্ন বলে জানা গেছে। এই একই ঘটনায় সাংবাদিকদের পাশাপাশি আরও দুই বেসামরিক ব্যক্তি প্রাণ হারিয়েছেন এবং নাবাতিহ জেলায় বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।
ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) এই হামলার কথা স্বীকার করেছে। তবে তাদের দাবি ভিন্ন। ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের মতে, তারা হিজবুল্লাহর একটি সামরিক স্থাপনা থেকে বের হওয়া দুটি সন্দেহভাজন গাড়িকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তাদের গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, ওই গাড়িগুলো সামরিক হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। উদ্ধারকাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে আইডিএফ জানিয়েছে, পুরো বিষয়টি বর্তমানে তাদের উচ্চতর পর্যায়ে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তবে ওই গাড়িতে সত্যিই কোনো সামরিক সরঞ্জাম ছিল কি না, তার কোনো প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
গত শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যস্থতায় লেবানন ও ইসরাইলের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হয়েছিল। কয়েক দিনের আপেক্ষিক শান্তির পর এই প্রাণঘাতী হামলা চুক্তিটির স্থায়িত্বকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। স্থানীয় বিশ্লেষকদের মতে, সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে চালানো এই ধরনের হামলা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের সরাসরি লঙ্ঘন।
নিহত আমাল খলিল ‘আল-আখবার’ পত্রিকায় কাজ করতেন যা লেবাননের একটি প্রভাবশালী বামপন্থী ও হিজবুল্লাহপন্থী গণমাধ্যম হিসেবে পরিচিত। পত্রিকাটি এই ঘটনাকে ‘সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড’ বলে অভিহিত করেছে। তাদের অভিযোগ, যুদ্ধের প্রকৃত চিত্র যেন বিশ্ববাসীর কাছে না পৌঁছায়, সেজন্যই সাংবাদিকদের টার্গেট করা হচ্ছে।
সাংবাদিকদের ওপর এই হামলার ঘটনায় জাতিসংঘ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটির এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের ওপর হামলা মানে তথ্যের কণ্ঠরোধ করা।” অন্যদিকে, কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছে। সিপিজে-এর মতে, মধ্যপ্রাচ্যে সাংবাদিকদের জন্য কর্মক্ষেত্র ক্রমশ অনিরাপদ হয়ে উঠছে, যা বিশ্ব সংবাদপত্রের স্বাধীনতার জন্য একটি অশনিসংকেত।
লেবাননের তথ্য মন্ত্রণালয় এই ঘটনাকে ‘নৃশংস অপরাধ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে এবং আন্তর্জাতিক বিচারিক সংস্থাগুলোর হস্তক্ষেপ কামনা করেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে উত্তেজনা আবারও তুঙ্গে উঠেছে, যা এই ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিকে যেকোনো মুহূর্তে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপান্তর করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
Leave a comment