নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্র নীতিতে এক উল্লেখযোগ্য ও ঐতিহাসিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ১২টি পারমাণবিক অস্ত্র (ওয়ারহেড) সক্রিয়ভাবে মোতায়েন করেছে ভারত। বিশ্বের শীর্ষ অস্ত্র-নজরদারি সংস্থা ‘স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ (এসআইপিআরআই)-এর প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার ভারতের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘এনডিটিভি’-এর এক প্রতিবেদনে এই পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েনের খবরটি বিশদভাবে প্রকাশ করা হয়।
এসআইপিআরআইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পারমাণবিক অস্ত্র সক্রিয় করার এই সিদ্ধান্ত নয়াদিল্লির বিগত কয়েক দশকের প্রতিষ্ঠিত সামরিক নীতি থেকে একটি বিশাল বিচ্যুতি। এতদিন পর্যন্ত দেশটিতে পারমাণবিক অস্ত্র (ওয়ারহেড) এবং সেগুলো বহনের মূল ব্যবস্থা বা লঞ্চার সম্পূর্ণ পৃথকভাবে সংরক্ষণ করা হতো। তবে এই প্রথম ভারতের পরমাণু অস্ত্রাগারের একটি অংশকে কেবল মজুত রাখার পরিবর্তে সরাসরি ‘কার্যক্রমের জন্য মোতায়েনকৃত’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র সাইলো (Silo) এবং অত্যাধুনিক পারমাণবিক সাবমেরিনে উৎক্ষেপণের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত অবস্থায় এই পারমাণবিক অস্ত্রগুলো রাখা হয়েছে, যা দেশটির সর্বোচ্চ সামরিক সতর্কাবস্থার দিকে ইঙ্গিত করে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এই ১২টি নতুন মোতায়েন করা ওয়ারহেডের মাধ্যমে ভারত প্রথমবারের মতো পারমাণবিক অস্ত্রকে সরাসরি বহন ব্যবস্থার সাথে যুক্ত করেছে অথবা সেগুলোকে সক্রিয় বাহিনীর স্থায়ী ঘাঁটিতে স্থাপন করেছে। এসআইপিআরআই জানিয়েছে, গত বছর একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রবাহী সাবমেরিনে (SSBN) অল্প সংখ্যক ওয়ারহেড মোতায়েন এবং সমুদ্রসীমায় প্রতিরোধমূলক বিশেষ টহল পরিচালনার পাশাপাশি ভারতের সামগ্রিক পারমাণবিক অস্ত্রের মজুতেও সামান্য বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে।
সোমবার প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়, চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত ভারতের ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক অস্ত্রের মোট মজুত প্রায় ১৯০টিতে পৌঁছেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে; যা আগের বছরের তুলনায় কিছুটা বেশি। এই পরমাণু অস্ত্রগুলো মূলত বিমান, স্থলভিত্তিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং সাবমেরিনের সমন্বয়ে গঠিত ভারতের ঐতিহ্যবাহী ‘পারমাণবিক ত্রিমাত্রিক ব্যবস্থা’ বা নিউক্লিয়ার ট্রায়াডে বিন্যস্ত রয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্রগুলোকে ক্যানিস্টারে (উৎক্ষেপণ নল) সুসজ্জিত রাখা এবং সমুদ্রভিত্তিক প্রতিরোধমূলক টহল পরিচালনার বর্তমান পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে, ভারত শান্তিকালীন সময়েই কিছু ওয়ারহেডকে তাদের লঞ্চারের সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত করার আধুনিক কৌশলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
তবে অস্ত্র মোতায়েনের এই বড় কৌশলগত পরিবর্তনের মধ্যেও ভারত তার দীর্ঘদিনের ‘আগে ব্যবহার নয়’ (No First Use) নীতি কঠোরভাবে বজায় রেখেছে। ভারত নীতিগতভাবে অন্য কোনো দেশের ওপর প্রথমে পারমাণবিক হামলা না চালানোর বিষয়ে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই নীতি অনুযায়ী, পারমাণবিক অস্ত্র কেবল ভারতীয় ভূখণ্ডে বা বিশ্বের যেকোনো স্থানে অবস্থানরত ভারতীয় বাহিনীর ওপর শত্রুভাবাপন্ন দেশের পারমাণবিক আক্রমণের পাল্টা চরম জবাব (Retaliation) হিসেবে ব্যবহার করা হবে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের ভাণ্ডারে থাকা এই সীমিত তবে অত্যন্ত কার্যকর পারমাণবিক অস্ত্রাগার কোনো আঞ্চলিক অস্ত্র প্রতিযোগিতায় জড়ানোর জন্য নয়, বরং কেবল সম্ভাব্য বহিরাগত আক্রমণকারীদের কৌশলগতভাবে নিরুৎসাহিত (Deterrence) করার জন্য তৈরি করা হয়েছে।
Leave a comment