Home জাতীয় ভরা মৌসুমেও চড়া দামে ইলিশ, কমেছে সরবরাহ
জাতীয়

ভরা মৌসুমেও চড়া দামে ইলিশ, কমেছে সরবরাহ

Share
Share

‎ম.ম.রবি ডাকুয়া,বাগেরহাট


ভরা মৌসুমের প্রায় দুই মাস শেষ হতে চললেও বাজারে ইলিশের সরবরাহ কম। যেটুকু পাওয়া যাচ্ছে, তার আকারও আগের তুলনায় ছোট। ফলে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে ইলিশ। এতে সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে দেশের জনপ্রিয় এই মাছ।

অন্যদিকে, ইলিশের কাঙ্ক্ষিত সরবরাহ না থাকায় হতাশ জেলেরাও। অনেক জেলে নদী ও সাগরে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ মাছ না পেয়ে খালি হাতে ফিরছেন। এতে দাদন নিয়ে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের লোকসান হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্ষাকাল ইলিশের প্রধান মৌসুম। দেশে আহরিত মোট ইলিশের প্রায় ৭০ শতাংশ পাওয়া যায় দক্ষিণাঞ্চলের নদী ও সাগর থেকে। তবে কয়েক বছর ধরে ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধির হার কমছে।

তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে ইলিশ আহরণ হয়েছিল ৫ দশমিক ৩২ লাখ টন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে তা বেড়ে ৫ দশমিক ৫০ লাখ টন, ২০২০-২১ সালে ৫ দশমিক ৬৫ লাখ টন এবং ২০২১-২২ সালে ৫ দশমিক ৬৬ লাখ টনে পৌঁছায়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে উৎপাদন বেড়ে ৫ দশমিক ৭১ লাখ টন হলেও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৫ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৭ টনে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন আরও কমে প্রায় ৫ লাখ টনে নেমে আসে।

ছোট হচ্ছে ইলিশের আকার

শুধু উৎপাদন ও সরবরাহ নয়, ইলিশের আকারও ছোট হয়ে আসছে বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা।

ইলিশ গবেষক ও বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক আনিসুর রহমান বলেন, গত দুই বছর ইলিশের সামগ্রিক উৎপাদন কমছে। একই সঙ্গে ইলিশের আকারও ছোট হয়েছে। একসময় ইলিশের গড় ওজন ৪০০ থেকে ৪৫০ গ্রাম থাকলেও এখন তা ৩০০ থেকে ৩৫০ গ্রামে নেমে আসছে।

তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, নদীদূষণ, নাব্যতা সংকট ও প্রজনন পরিবেশ ব্যাহত হওয়ার কারণে ইলিশের ওপর প্রভাব পড়ছে। পরিস্থিতি উত্তরণে নদীর পরিবেশ রক্ষা ও সঠিক গবেষণার ওপর জোর দেন তিনি।

খুলনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. বদরুজ্জামান বলেন, একটি ইলিশ এক থেকে দেড় কেজি ওজনের হতে অন্তত দেড় বছর সময় লাগে। নদীতে ডিম ফুটে বাচ্চা ইলিশ সাগরে যায় এবং কিছুটা বড় হয়ে আবার ডিম ছাড়তে মিঠাপানিতে ফিরে আসে। কিন্তু অতিরিক্ত মাছ শিকারের কারণে বর্তমানে ইলিশের এই জীবনচক্র ব্যাহত হচ্ছে।

তিনি বলেন, মোহনায় নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার, বালু উত্তোলন, শিল্পকারখানার দূষণ ও অনিয়ন্ত্রিত অবকাঠামো নির্মাণের কারণে নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ ও প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি সাগরে ট্রলিং জাহাজের মাধ্যমে মা ইলিশ ও জাটকা শিকারেও বড় ইলিশের সংকট তৈরি হচ্ছে।

চড়া দামেও মিলছে না বড় ইলিশ

বাজারে ছোট আকারের ইলিশের সরবরাহও কম। সরবরাহ সংকটের সুযোগ নিয়ে চড়া দামে মাছ বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া বাজারে দীর্ঘদিন হিমায়িত করে রাখা ইলিশ বিক্রির অভিযোগও পাওয়া গেছে।

বাজারে ইলিশ কিনতে আসা এক ক্রেতা বলেন, ‘৩ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে এক কেজি ইলিশ কেনার সামর্থ্য আমাদের নেই। বাঙালির প্রিয় ইলিশ এখন শুধু রাজাদের মাছে পরিণত হয়েছে।’

আরেক ক্রেতা বলেন, ‘মৌসুমেও যদি এত দাম হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ ইলিশ খাবে কীভাবে? নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কোনো কার্যকর তদারকি চোখে পড়ে না।’

খুচরা ব্যবসায়ীরা ইলিশের চড়া দামের পেছনে অতিরিক্ত হাতবদল ও সিন্ডিকেটকে দায়ী করছেন। তাঁদের দাবি, আহরণ থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত ইলিশ কয়েক দফা হাতবদল হয়। প্রতিটি ধাপেই দাম বাড়ে। পাশাপাশি দাদন, বরফ ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় মাছ আহরণের খরচও বেড়েছে।

একজন বিক্রেতা জানান, সরবরাহ কম থাকায় তাঁরা আগের বছরের মজুত করা ‘হিম ইলিশ’ও বিক্রি করছেন। বর্তমানে বাজারে ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রাম ওজনের ছোট ইলিশ ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা, এক কেজির ইলিশ প্রায় ৩ হাজার ৫০০ টাকা এবং দেড় কেজির ইলিশ প্রায় ৪ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

তবে দীর্ঘদিন হিমায়িত করে রাখা ইলিশের গুণগত মান ও খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা মাছের গুণগত মান ও পুষ্টিমান কমতে পারে। সংরক্ষণে ত্রুটি থাকলে খাদ্যজনিত অসুস্থতার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

অবতরণ কেন্দ্রেও কমেছে ইলিশ

ইলিশ সংকটের প্রভাব পড়েছে সরকারি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রগুলোতেও। বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) আওতায় সারা দেশে ২০টি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের মধ্যে পাঁচটি বন্ধ এবং নয়টি সীমিত পরিসরে চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

খুলনা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছরের মধ্যে চলতি মৌসুমে এখানেই সবচেয়ে কম ইলিশ এসেছে। চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত এই কেন্দ্রে মাত্র প্রায় দেড় হাজার কেজি ইলিশ এসেছে। অথচ ২০২২ সালের জুলাইয়ে এসেছিল ৩৮ হাজার ৫৪৬ কেজি, ২০২৩ সালে ১৫ হাজার ৯৭৬ কেজি এবং ২০২৪ সালে ৮ হাজার ৩৯১ কেজি।

দেশের অন্যান্য বড় মাছের মোকামেও ইলিশের সরবরাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

অভয়াশ্রম রক্ষার তাগিদ

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইলিশের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র রক্ষায় নিঝুম দ্বীপ, নাফ নদীসহ ছয়টি এলাকাকে অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হলেও এসব অভয়াশ্রম কার্যকরভাবে রক্ষা করা যায়নি। এতে ইলিশের উৎপাদন কমেছে।

তাঁরা বলছেন, জাটকা ও মা ইলিশ ধরা পুরোপুরি বন্ধ করা গেলে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। এ জন্য মৎস্য সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালার কার্যকর প্রয়োগ, নিষিদ্ধ ট্রলিং বন্ধ, সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা এবং জেলেদের তালিকা হালনাগাদ করে উপযুক্ত প্রণোদনা নিশ্চিত করা জরুরি।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Don't Miss

চীনের তৈরি জে-১০ সিই যুদ্ধবিমান কেনার পথে সরকার: তথ্য উপদেষ্টা

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে চীনের তৈরি জে-১০সি যুদ্ধবিমান কেনার প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান।...

ট্রাম্পের ছেলেকে হত্যার পরিকল্পনা ইরানের, ১ কোটি ডলার পুরস্কার ঘোষণা!

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে ক্রমাগত প্রাণনাশের হুমকি ও উসকানিমূলক পদক্ষেপ আরও তীব্র করে তুলেছে ইরান। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম...

Related Articles

খোঁজ নেই পিন্টু দাসসহ পরিবারের ৪ সদস্যের, কেউ বলছে ‘দেনার দায়ে’

চাঁদপুর শহরের স্বনামধন্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ‘এসকে শিল্পালয়’-এর স্বত্বাধিকারী পিন্টু দাসসহ তাঁর পরিবারের চার...

মাজার ধ্বংস করলে ঘরে বসে থাকব না: প্রতিমন্ত্রী আজাদ

পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেছেন, দেশে কোনো মাজার, পীরের তরিকা বা...

রংপুরে চার খুন: মা-মেয়ের ফরেনসিক রিপোর্টে কি ধর্ষণের আলামত মিলেছে?

রংপুরে একই পরিবারের চার সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় নিহত মা ও মেয়ের...

মায়েদের সম্পৃক্ততায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রান্না করা খাবার দেওয়ার উদ্যোগ

শ্রীলঙ্কা ও ভারতের তামিলনাড়ুর অভিজ্ঞতা অনুসরণ করে বাংলাদেশেও মায়েদের সম্পৃক্ততায় রান্না করা...