১৯৯১ সালের ২ ডিসেম্বর। ইতালির কাগলিয়ারিতে এইডস বিষয়ক এক সম্মেলনে ঘটে যায় এমন একটি ঘটনা, যা পরে এইচআইভি আক্রান্ত মানুষের প্রতি সামাজিক ভয় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতীক হয়ে ওঠে। মঞ্চে সবার সামনে এইচআইভি নিয়ে বসবাসকারী ২৫ বছর বয়সী রোসারিয়া ইয়ারদিনোকে ঠোঁটে চুমু দেন ইতালির চিকিৎসক ও এইচআইভি বিশেষজ্ঞ ফার্নান্দো আইউতি।
সেই সময় এইচআইভি নিয়ে মানুষের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ও ভুল ধারণা ছিল। আক্রান্ত ব্যক্তিকে স্পর্শ করা, আলিঙ্গন করা কিংবা চুমু দেওয়ার মাধ্যমেও ভাইরাস ছড়াতে পারে—এমন ধারণা অনেকের মধ্যে ছিল। এই সামাজিক ভয়ের বিরুদ্ধেই প্রতীকী বার্তা দিতে চেয়েছিলেন আইউতি ও ইয়ারদিনো।
ঘটনাটি ঘটে কাগলিয়ারির একটি মেলার মাঠে আয়োজিত এইডস বিষয়ক সম্মেলনে। এইচআইভি সংক্রমণ নিয়ে আলোচনার একপর্যায়ে আইউতি মঞ্চ থেকে নেমে ইয়ারদিনোর কাছে যান। তাঁকে আলিঙ্গন করার পর চুমু দেন। একজন ফটোসাংবাদিক সেই মুহূর্তটি ক্যামেরাবন্দী করেন। পরে ছবিটি ইতালির গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়।
ইয়ারদিনো তখন ২৫ বছর বয়সী। কয়েক বছর ধরে তিনি এইচআইভি নিয়ে বসবাস করছিলেন। পরে তিনি জানান, চুমু দেওয়ার সিদ্ধান্তটি তাঁরা আগের রাতেই নিয়েছিলেন। তাঁদের ধারণা ছিল, শুধু বৈজ্ঞানিক তথ্য দিয়ে মানুষের ভয় দূর করা কঠিন; একটি প্রতীকী ঘটনা বিষয়টি মানুষের কাছে আরও সরাসরি পৌঁছে দিতে পারে।
সেই সময়ে এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তিদের ঘিরে সামাজিক বৈষম্য ছিল ব্যাপক। আক্রান্ত ব্যক্তিদের অনেকেই পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও সমাজে নানা ধরনের বঞ্চনা ও দূরত্বের শিকার হতেন। ভুল ধারণার কারণে কেউ কেউ মনে করতেন, আক্রান্ত ব্যক্তিকে স্পর্শ করা বা তাঁর সঙ্গে একই পরিবেশে থাকলেও ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে।
তবে বৈজ্ঞানিকভাবে এইচআইভি সাধারণ চুম্বন, আলিঙ্গন বা দৈনন্দিন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়ায় না। ভাইরাসটি মূলত রক্ত, বীর্য, যোনি ও মলদ্বারের তরল এবং বুকের দুধের মতো নির্দিষ্ট শারীরিক তরলের মাধ্যমে সংক্রমিত হয়। লালায় ভাইরাসের উপস্থিতি থাকলেও সাধারণ চুম্বনের মাধ্যমে এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি নেই।
১৯৯১ সালে এসব বিষয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বর্তমান সময়ের মতো স্পষ্ট ধারণা ছিল না। তাই আইউতির ওই চুম্বনকে চিকিৎসার কোনো পদ্ধতি হিসেবে নয়, বরং এইচআইভি নিয়ে মানুষের ভয়, ভুল ধারণা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে একটি প্রতীকী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়।
ছবিটি ইতালি ছাড়িয়ে জাপানসহ বিভিন্ন দেশের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একসময়ের আলোচিত সেই মুহূর্ত এইচআইভি আক্রান্ত মানুষের প্রতি সহমর্মিতা এবং সামাজিক কলঙ্কের বিরুদ্ধে সচেতনতার প্রতীকে পরিণত হয়।
ইয়ারদিনো পরবর্তী সময়েও এইচআইভি সচেতনতা ও বৈষম্যবিরোধী কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। অন্যদিকে ফার্নান্দো আইউতি ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে ৮৩ বছর বয়সে মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর ইয়ারদিনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে স্মরণ করেন এবং সেই ঐতিহাসিক চুম্বনের কথাও উল্লেখ করেন।
তিন দশকের বেশি সময় পরও কাগলিয়ারির সেই ছবি এইচআইভি নিয়ে সচেতনতা ও বৈষম্যবিরোধী আলোচনায় ফিরে আসে। কারণ ছবিটি শুধু একজন চিকিৎসক ও একজন রোগীর মধ্যকার একটি মুহূর্ত ছিল না; এটি ছিল এমন এক সময়ে সামাজিক ভয়ের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য অবস্থান, যখন এইচআইভি নিয়ে ভুল ধারণা আক্রান্ত মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছিল।
সূত্র: এএনএসএ, কোরিয়েরে দেলা সেরা
Leave a comment