Home জাতীয় বর্ষা এলেই বাড়ে ভয়, উৎকণ্ঠায় টেকনাফ পাহাড়ের ঢালে বসবাসকারী মানুষ
জাতীয়

বর্ষা এলেই বাড়ে ভয়, উৎকণ্ঠায় টেকনাফ পাহাড়ের ঢালে বসবাসকারী মানুষ

Share
Share

মোহাম্মদ ইউনুছ অভি, টেকনাফ


বর্ষা মৌসুম শুরু হলেই কক্সবাজারের টেকনাফের পাহাড় ও টিলার পাদদেশে বসবাসকারী হাজারো মানুষের মধ্যে নেমে আসে আতঙ্ক। কয়েক দিন ধরে টানা বা ভারী বৃষ্টি হলেই বাড়তে থাকে পাহাড়ধসের শঙ্কা। জীবিকার তাগিদ, দারিদ্র্য ও বিকল্প আবাসনের অভাবে ঝুঁকি জেনেও পাহাড়ঘেঁষা এলাকায় বসবাস করছেন নিম্ন আয়ের অসংখ্য পরিবার। ফলে প্রতি বর্ষাতেই প্রাণহানি ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা নতুন করে সামনে আসে।

সম্প্রতি কয়েক দিনের থেমে থেমে বৃষ্টিতে উপজেলার বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় ধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত পাহাড়গুলোতে নতুন করে বসতি স্থাপন বন্ধ না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। শুধু গত এক বছরে অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত ১২টি পাহাড়ে শতাধিক নতুন ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এসব ঘরে বর্তমানে হাজারো মানুষ বসবাস করছেন। ভারী বর্ষণ হলে যেকোনো সময় পাহাড়ধসে ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হওয়ার পাশাপাশি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, টানা বর্ষণে ভূমিধসের ঝুঁকিতে টেকনাফ পৌরসভা এবং হ্নীলা, বাহারছড়া ও হোয়াইক্যং ইউনিয়নের অন্তত ৩২টি পাহাড়ি এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকায় প্রায় সাত হাজার পরিবারের অর্ধলাখের বেশি মানুষ বসবাস করে।

ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে ফকিরামোড়া, বৈদ্যরঘোনা, কুয়েত মসজিদ এলাকা, পুরান পল্লানপাড়া, নাইট্যংপাড়া, বরইতলী, ঘুমতলী, মরিচ্যাগোনা, পশ্চিম সিকদারপাড়া, মুরাপাড়া, লেচুয়াপ্রাং, ভিলেজারপাড়া, পশ্চিম রঙ্গীখালী, গাজীপাড়া, আলীখালী, লম্বাবিল, রইক্ষ্যং, করাচীপাড়া, কতুবদিয়াপাড়া, আমতলী, দৈংগাকাটা, হরিখোলা, কেরুনতলী, বালুখালী, চাকমারকুল, কম্বনিয়াপাড়া, শিয়াইল্যামুরা, সাতঘরিয়াপাড়া, হাছইন্নাটেক, শামলাপুর পুরানপাড়া, বড় ডেইল, মাথাভাঙ্গা জাহাজপুরা, মারিষবুনিয়া ও বাইন্যাপাড়া।

টেকনাফ পৌরসভার শিয়াইল্যাগুনা এলাকার বাসিন্দা ও পেশায় জেলে মো. জাকির হোসেন বলেন, “ভারী বৃষ্টি হলেই পাহাড়ে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। সব সময় পাহাড়ধসের ভয় কাজ করে। কিন্তু অন্য কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই বলেই ঝুঁকি নিয়েই এখানে বসবাস করছি।”

একই এলাকার বাসিন্দা নুর ফাতেমা বলেন, “সামর্থ্য না থাকায় প্রায় ১০ বছর আগে পাহাড়ি এলাকায় বসবাস শুরু করি। কয়েক দিন ভারী বৃষ্টি হলেই আতঙ্কে থাকতে হয়। কখন পাহাড় ভেঙে পড়ে, সেই শঙ্কা সব সময় কাজ করে। নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য বর্ষাকালে পাহাড়ি সরু পথ দিয়ে চলাচলও খুব ঝুঁকিপূর্ণ।”

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত এক দশকে টেকনাফে পাহাড়ধসের ঘটনায় অন্তত ১৫ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে ২০১০ সালের ১৫ জুন। ওই দিন ফকিরামোড়া, টুন্ন্যামোড়া ও হ্নীলা সিকদারপাড়ায় ভয়াবহ পাহাড়ধসে ৩৪ জন নিহত হন। একই ঘটনায় দেড় শতাধিক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয় এবং শতাধিক মানুষ আহত হন। এর আগে ২০০৯ সালের জুলাইয়ে পৃথক পাহাড়ধসে একই পরিবারের চার সদস্যসহ ১৩ জনের মৃত্যু হয়। ১৯৮৯ সালে ফকিরামোড়ায় পাহাড়ধসে এক পরিবারের সাত সদস্যসহ ১১ জন প্রাণ হারান।

বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে উপজেলা প্রশাসন ও বন বিভাগ ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করে সতর্কবার্তা প্রচার করা হচ্ছে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলো চিহ্নিত করে উচ্ছেদ ও পুনর্বাসনের লক্ষ্যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

বন বিভাগের টেকনাফ রেঞ্জ কর্মকর্তা আবদুর রশিদ আহমেদ বলেন, “পাহাড়ি এলাকায় নতুন করে কোনো ধরনের অবৈধ বসতি স্থাপন করতে দেওয়া হচ্ছে না। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসরত পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়েও কাজ চলছে। পাহাড়ধসের ঝুঁকি কমাতে নিয়মিত নজরদারি ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।”

তবে স্থানীয়দের মতে, শুধু বর্ষা মৌসুমে সতর্কতা জারি করলেই হবে না। দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন পরিকল্পনা এবং অবৈধ দখল উচ্ছেদে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে প্রতিবছরই একই ঝুঁকির মুখে পড়তে হবে হাজারো মানুষকে। বর্ষা যত ঘনিয়ে আসছে, ততই টেকনাফের পাহাড়ঘেরা জনপদগুলোতে বাড়ছে উৎকণ্ঠা। নিরাপদ আশ্রয়ের অপেক্ষায় দিন গুনছেন পাহাড়ের ঢালে বসবাসকারী অসহায় পরিবারগুলো।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Don't Miss

৩ দাবি মানলে ঢাকা শহরে আর ককটেল ফুটবে না : নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী

সরকার তিন দফা দাবি মেনে নিলে ঢাকা শহরে আর কোনো ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটবে না বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য...

মুরাদনগরে নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগের ৩ সদস্য গ্রেপ্তার

মো. ইয়াছিন সরকার, কুমিল্লা কুমিল্লার মুরাদনগরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে উপজেলার...

Related Articles

শাহবাজ শরিফের সঙ্গে তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ শাহবাজ শরিফের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক...

হাসিনাসহ ৮ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানি ২৭ সেপ্টেম্বর

রাজধানীর কল্যাণপুরের জাহাজবাড়িতে ‘জঙ্গি নাটক’ সাজিয়ে ৯ তরুণকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের...

জাতিসংঘে খলিলুর রহমানের দপ্তরের লিগ্যাল অফিসার জাইমা রহমান

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি ড. খলিলুর রহমানের কার্যালয়ে ‘লিগ্যাল অফিসার’...

আগামী ২৪ ঘণ্টায় ভারি বৃষ্টি হতে পারে দেশের যেসব অঞ্চলে

উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট গভীর নিম্নচাপটি উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর...

;