মোহাম্মদ ইউনুছ অভি টেকনাফ
কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের পাহাড়ঘেঁষা জনপদে অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় ও সশস্ত্র হামলার ঘটনায় চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। অপহরণকারীদের ভয়ে অন্তত ২০০ পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে আত্মীয়-স্বজনের বাসায় আশ্রয় নিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রোহিঙ্গা ও স্থানীয় সন্ত্রাসীদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা কয়েকটি সশস্ত্র চক্র দীর্ঘদিন ধরে অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের সঙ্গে জড়িত।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বাহারছড়ার জুম্মাপাড়া, কচ্ছপিয়া ও আশপাশের এলাকায় প্রায়ই রাতের আঁধারে গুলিবর্ষণ, ভাঙচুর ও আতঙ্ক সৃষ্টির ঘটনা ঘটছে। এ কারণে অনেক পরিবার নিজ বাড়িতে ফিরতে সাহস পাচ্ছে না।
জুম্মাপাড়া এলাকার বাসিন্দা খালেদা বেগম বলেন, গভীর রাতে বাড়ির চারপাশে গুলিবর্ষণ ও দরজায় হামলার ঘটনায় তিনি সন্তানকে নিয়ে প্রাণভয়ে আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা রুবীনা আক্তার ও নাজমা আক্তারও।
গত ২৮ জুন জুম্মাপাড়া এলাকা থেকে পল্লী চিকিৎসক কামাল উদ্দিনকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করা হয়। পরিবারের দাবি, দুই লাখ টাকা মুক্তিপণ দেওয়ার আট দিন পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এছাড়া ১৭ জুলাই উত্তর নয়াপাড়া এলাকায় ১২ বছর বয়সী এক শিশুকে অপহরণ করে ১২ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। পরে চার লাখ টাকা দিয়ে তাকে উদ্ধার করা হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অপহরণকারীরা প্রবাসী বা আর্থিকভাবে সচ্ছল পরিবারের সদস্যদের টার্গেট করে। তাদের একটি তথ্যদাতা নেটওয়ার্ক রয়েছে, যারা সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে।
স্থানীয়দের দাবি, রেদওয়ান গ্রুপ, বুলেট গ্রুপ ও আবুল গ্রুপ নামে পরিচিত কয়েকটি সশস্ত্র চক্র বাহারছড়া এলাকার দুর্গম পাহাড়ে আস্তানা গড়ে অপহরণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে পুলিশ এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য জানায়নি।
টেকনাফ মডেল থানার ওসি মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, অপহরণের ঘটনায় মুক্তিপণ আদায়ের তথ্য পাওয়া গেছে। জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত টেকনাফের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ২৯৫ জন অপহরণের শিকার হয়েছেন। চলতি বছরও এ পর্যন্ত অন্তত ২০টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে।
অপহরণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সম্প্রতি বিশেষ আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় অপহরণপ্রবণ এলাকায় পুলিশ চৌকি স্থাপন এবং যৌথ অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে টানা বৃষ্টির কারণে অভিযান শুরু করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমান বলেন, যৌথ অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয়দের সহযোগিতায় দ্রুত অভিযান চালিয়ে অপহরণকারী চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে বাহারছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন খোকন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা দ্রুত যৌথ অভিযান পরিচালনা এবং এলাকায় স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। স্থানীয়দের আশা, কার্যকর অভিযান পরিচালিত হলে আতঙ্কে বাড়িছাড়া পরিবারগুলো আবারও নিজ ঘরে ফিরতে পারবে।
Leave a comment