সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের মূলধারার গণমাধ্যম, বিশেষ করে টেলিভিশন সংবাদমাধ্যম, আস্থার সংকটের মুখে পড়েছে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে। একসময় টেলিভিশন ছিল সাধারণ মানুষের খবর জানার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। তবে সংবাদ পরিবেশনে পক্ষপাতের অভিযোগ, রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিতর্ক এবং জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব না দেওয়ার অভিযোগের কারণে অনেক দর্শক এসব সংবাদমাধ্যমের ওপর আস্থা হারাচ্ছেন। এ কারণেই সমালোচকেরা মূলধারার কিছু সংবাদমাধ্যমকে ‘গোদি মিডিয়া’ বলে উল্লেখ করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই আস্থাহীনতার প্রভাব পড়েছে টেলিভিশন সংবাদমাধ্যমের দর্শকসংখ্যা ও বিজ্ঞাপন আয়ে। ফলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ব্যয় সংকোচনের অংশ হিসেবে কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘটনাও বাড়ছে।
বিকল্প হিসেবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম
প্রচলিত সংবাদমাধ্যমের প্রতি আস্থা কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে অনেক দর্শক ইউটিউব, ফেসবুক ও অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের দিকে ঝুঁকছেন। স্বাধীন সাংবাদিক ও বিকল্প গণমাধ্যমগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি অনুসারী পাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের মতে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যেমন স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের সুযোগ রয়েছে, তেমনি ভুল তথ্য ও যাচাইবিহীন তথ্য ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও রয়েছে। তাই যেকোনো তথ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে একাধিক নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে যাচাই করার পরামর্শ দেন তাঁরা।
‘ভেন্টিলেশনে’ টেলিভিশন সংবাদমাধ্যম
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক পোস্টে প্রবীণ সাংবাদিক শুভ মৈত্র দাবি করেন, ২৪ ঘণ্টার সংবাদচ্যানেলগুলো কার্যত ‘ভেন্টিলেশনে’ চলে গেছে। তাঁর ভাষ্য, সংবাদ পরিবেশনের মান কমে যাওয়া এবং পেশাগত স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার কারণে গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি আরও দাবি করেন, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা–সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সূচকে ভারতের অবস্থানও আগের তুলনায় পিছিয়েছে।
ছাঁটাই নিয়ে উদ্বেগ
লেখক ও সাংবাদিক গৌতম বসুমল্লিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, করপোরেট মালিকানাধীন সংবাদমাধ্যমে কর্মরত অনেক সাংবাদিক হঠাৎ করেই চাকরি হারাচ্ছেন। মাঠপর্যায়ের সাংবাদিক, ডেস্ককর্মী, ক্যামেরাপারসন ও অন্যান্য কর্মীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তাঁর মতে, এসব ছাঁটাইয়ের বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের সংগঠিত প্রতিবাদও খুব একটা দেখা যায় না, যা পেশাটির অনিশ্চয়তাকেই সামনে নিয়ে আসে।
নিউজ ১৮ বাংলায় ছাঁটাইয়ের দাবি
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি ‘নিউজ ১৮ বাংলা’ থেকে প্রায় ২৮ জন সংবাদকর্মীকে ছাঁটাই করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। প্রতিবেদক, ডেস্ককর্মী, ক্যামেরাপারসন, গ্রাফিকস ডিজাইনার ও ডিজিটাল বিভাগের কর্মীরা এই ছাঁটাইয়ের শিকার হয়েছেন বলে ওই দাবিতে উল্লেখ করা হয়।
একই সঙ্গে আর্থিক পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে কর্মী ছাঁটাই করা হলেও নতুন উপস্থাপক নিয়োগ এবং সম্পাদকীয় নীতিতে পরিবর্তন আনার অভিযোগও উঠেছে। তবে এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সম্পাদকীয় নীতির পরিবর্তন নিয়েও আলোচনা
গণমাধ্যম–সংশ্লিষ্ট কয়েকজন পর্যবেক্ষকের দাবি, কিছু সংবাদমাধ্যমে নেতৃত্ব পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সম্পাদকীয় অবস্থানেও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এর ফলে একই সংবাদমাধ্যমের উপস্থাপনা ও রাজনৈতিক অবস্থানে দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, যা দর্শকদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করছে বলেও তাঁদের অভিমত।
সামনে কী?
বিশ্লেষকদের মতে, সংবাদমাধ্যমের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো বিশ্বাসযোগ্যতা। নিরপেক্ষ, তথ্যনির্ভর ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সংবাদ প্রকাশে গুরুত্ব না দিলে মূলধারার গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা আরও কমতে পারে।
অন্যদিকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের জনপ্রিয়তা বাড়লেও সেখানে তথ্য যাচাই, সম্পাদকীয় মান এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। তাই গণমাধ্যমের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে বিশ্বাসযোগ্যতা, পেশাগত স্বাধীনতা এবং বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের ওপর।
Leave a comment