পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এক নজিরবিহীন ও চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। ভারতের নির্বাচন কমিশনের ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (SIR) বা বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধনী প্রক্রিয়ার প্রভাবে রাজ্যের অন্তত ৪১টি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনের রাজনৈতিক ও জনতাত্ত্বিক কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের ফলে সংশ্লিষ্ট আসনগুলোতে গত কয়েক দশকের প্রতিষ্ঠিত নির্বাচনী সমীকরণ পুরোপুরি বদলে যেতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ বা তথ্যের যৌক্তিক অসঙ্গতির কারণ দেখিয়ে রাজ্যজুড়ে প্রায় ২৭.১৬ লক্ষ নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে। তবে রাজনৈতিক মহলে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি করেছে বাদ পড়া ভোটারদের সাম্প্রদায়িক পরিসংখ্যান। প্রাপ্ত তথ্যমতে, এই ২৭ লক্ষাধিক ভোটারের মধ্যে প্রায় ১৭ লক্ষই মুসলিম সম্প্রদায়ের।
সবচেয়ে আলোচিত চিত্র দেখা গেছে মুর্শিদাবাদ জেলার জঙ্গিপুর আসনে। তথ্য বলছে:
• পূর্বতন অনুপাত: হিন্দু ৪৬% : মুসলিম ৫৪%
• বর্তমান অনুপাত: হিন্দু ৫২% : মুসলিম ৪৮% অর্থাৎ, ভোটার তালিকা সংশোধনের মাধ্যমে এই আসনটি কার্যত রাতারাতি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ থেকে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে পরিণত হয়েছে। জঙ্গিপুরে বাদ পড়া ৩৬,৫৮১ জন ভোটারের মধ্যে ৩২,৫০০ জনই মুসলিম সম্প্রদায়ের।
কেবল জঙ্গিপুর নয়, মুর্শিদাবাদের লালগোলা, ভগবানগোলা এবং রঘুনাথগঞ্জেও একই ধরণের চিত্র ফুটে উঠেছে।
• লালগোলা: ৫৫ হাজার বাদ পড়া ভোটারের মধ্যে ৫২ হাজারই মুসলিম।
• ভগবানগোলা: ৪৭,৪৯৩ জন ভোটার বাদ পড়েছেন, যার মধ্যে হিন্দু ভোটার মাত্র ৩ হাজার।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে যেখানে মুসলিম ভোট তৃণমূল এবং কংগ্রেসের মধ্যে ভাগ হয়ে যাওয়ার কারণে বিজেপি অনেক আসনে লিড পেয়েছিল, সেখানে ভোটার তালিকার এই নতুন বিন্যাস বিজেপিকে আরও সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক আব্দুল মতিনের মতে, ভোটার তালিকার এই ব্যাপক পরিবর্তন মুসলিম ভোটারদের মধ্যে একধরণের ‘অস্তিত্ব রক্ষার মেরুকরণ’ তৈরি করতে পারে। তাঁর মতে, “বিজেপিকে ঠেকাতে মুসলিম ভোটাররা কি ২০২১ সালের মতো এককভাবে তৃণমূলের দিকে ঝুঁকবে, নাকি ২০২৪-এর মতো কংগ্রেস ও তৃণমূলের মধ্যে ভোট ভাগ হয়ে যাবে—তার ওপরই নির্ভর করছে এই ৪১টি আসনের ভাগ্য।”
বিশেষ করে মালদা, মুর্শিদাবাদ এবং উত্তর দিনাজপুরের আটটি আসনে চতুর্মুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। সেখানে সামান্য কয়েক হাজার ভোটের ব্যবধানেও জয়-পরাজয় নির্ধারিত হতে পারে। দক্ষিণবঙ্গে লড়াই মূলত তৃণমূল বনাম বিজেপি দ্বিমুখী হলেও, উত্তরবঙ্গে কংগ্রেস ও বামপন্থীদের প্রভাবে লড়াই অনেক বেশি জটিল হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
যদিও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এটি একটি রুটিন প্রক্রিয়া এবং কেবল তথ্যে ভুল থাকা ভোটারদেরই বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে বিরোধী দলগুলো এই প্রক্রিয়াকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে দাবি করছে।
আজ প্রথম দফার ভোটগ্রহণ শুরুর প্রাক্কালে এই ভোটার তালিকার ইস্যুটি রাজ্যের রাজনৈতিক উত্তাপকে নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে। ভোটার তালিকায় নাম না থাকায় বহু মানুষ ভোটদান থেকে বঞ্চিত হতে পারেন, যা নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলে বড় ধরণের প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
- আব্দুল মতিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক
- উত্তরবঙ্গ নির্বাচনী লড়াই
- জঙ্গিপুর বিধানসভা সমীকরণ
- তৃণমূল বনাম বিজেপি পশ্চিমবঙ্গ
- নির্বাচন কমিশন স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন
- পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬
- পশ্চিমবঙ্গ ভোটার তালিকা সংশোধন ২০২৬
- বিজেপি নির্বাচনী সুবিধা
- মুর্শিদাবাদ ভোটার তালিকা ছাঁটাই
- মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পশ্চিমবঙ্গ
Leave a comment