টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে দেশের সাতটি জেলায় স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যা ও পাহাড়ধস দেখা দিয়েছে। এতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে লাখ লাখ মানুষের জনজীবন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণহানির সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে ৫১ জনে দাঁড়িয়েছে। দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ১০ লাখ অতিক্রম করেছে। প্লাস্টিকের ঝুড়ি আর কাঠের তক্তা বিছিয়ে কোনোমতে মাচা বানিয়ে আশ্রয় নেওয়া দুর্গত মানুষদের চোখে এখন শুধুই বেঁচে থাকার আকুতি।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বন্যাকবলিত জেলাগুলোর ৫৯টি উপজেলার ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি পরিবার সম্পূর্ণ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। মোট ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন। সরকারি হিসাবে, বন্যা, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫১ জনে, যার মধ্যে সর্বোচ্চ ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে একমাত্র কক্সবাজার জেলায়। এছাড়া চট্টগ্রামে ১৩ জন, বান্দরবানে ৬ জন, রাঙামাটিতে ৩ জন এবং মৌলভীবাজারে ১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
গত ৫ জুলাই থেকে চট্টগ্রাম অঞ্চলে শুরু হওয়া রেকর্ডভাঙা মৌসুমি বৃষ্টির কারণেই মূলত এই দুর্যোগের সূত্রপাত। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত কয়েক দিনে চট্টগ্রামে ১ হাজার ৩৫৪ দশমিক ৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এই ভারী বর্ষণ ও ঢলের পানিতে দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ জনপদ কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশের বহু গ্রামে কোথাও হাঁটু তো কোথাও কোমরসমান পানি। অধিকাংশ নলকূপ পানির নিচে তলিয়ে থাকায় দুর্গত এলাকাগুলোতে বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে অনেক জায়গায় এখনো সরকারি বা বেসরকারি ত্রাণ পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
চট্টগ্রাম বিভাগের কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির পাশাপাশি সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলাও এখন বন্যার কবলে। তবে তিন পার্বত্য জেলা ও কক্সবাজারের কিছু অংশ থেকে পানি ধীরগতিতে নামতে শুরু করায় মানুষ আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে ঘরে ফিরতে শুরু করেছেন। কিন্তু পানি কমার সাথে সাথেই ভেসে উঠছে ক্ষয়ক্ষতির রূঢ় চিত্র। নষ্ট হয়ে গেছে আমন ও আউশের বীজতলা, জুমখেত এবং গ্রামীণ সড়ক ও সেতু। অন্যদিকে, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। উপরন্তু, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও কুড়িগ্রামের নদ-নদীগুলোর পানি অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় এসব এলাকাতেও স্বল্পমেয়াদি বন্যা ও তীব্র নদীভাঙনের শঙ্কা করা হচ্ছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী দুই-তিন দিনও দেশের কিছু অংশে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে চট্টগ্রাম অঞ্চলে আগামী এক দিনের মধ্যে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে। সিলেট অঞ্চলের নিম্নাঞ্চলের পরিস্থিতি কেমন হবে, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করছে বৃষ্টিপাতের পরিমাণের ওপর। বর্তমানে বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে স্থানীয় প্রশাসনের তদারকিতে জরুরি উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
Leave a comment