ম. ম. রবি ডাকুয়া, বাগেরহাট
প্রতি বছর ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত তিন মাস সুন্দরবনে পর্যটক, জেলে ও বনজীবীদের প্রবেশ বন্ধ থাকে। এ সময় মানুষের কোলাহল ও অন্যান্য কর্মকাণ্ড না থাকায় বনের প্রাণিকুলের জন্য স্বস্তিদায়ক পরিবেশ তৈরি হয়। প্রাণীদের স্বাভাবিক বিচরণ বাড়ার পাশাপাশি মাছ ও বন্যপ্রাণীর প্রজননও নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয় বলে জানিয়েছে বন বিভাগ।
বন বিভাগ জানায়, এ সময় সুন্দরবনে সাধারণ দর্শনার্থী ও বনজীবীদের জন্য পাস–পারমিট ইস্যু বন্ধ রাখা হয়। পাশাপাশি অবৈধ শিকার ও বনজ সম্পদ আহরণ ঠেকাতে নজরদারি জোরদার করা হয়। এতে বাঘ, হরিণ, বিভিন্ন প্রজাতির পাখিসহ বন্যপ্রাণীরা নির্বিঘ্নে চলাফেরা করতে পারে। একই সঙ্গে নদী ও খালের মাছ নিরাপদে ডিম ছাড়তে পারে, যা জলজ প্রাণীর বংশবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, চলতি বছরের জুলাই মাসে সুন্দরবনের পাঁচটি এলাকায় অন্তত আটবার বাঘের দেখা মিলেছে। একই সময়ে বিভিন্ন এলাকায় ঝাঁকে ঝাঁকে হরিণও দেখা গেছে। তাঁদের মতে, তিন মাস মানুষের প্রবেশ বন্ধ থাকায় বনের পরিবেশ তুলনামূলক শান্ত হয়েছে, যা প্রাণীদের স্বাভাবিক বিচরণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
২০২৪ সালে বন বিভাগের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা ১২৫টি। আর ২০২৩ সালে বন বিভাগ ও ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) পরিচালিত জরিপে সুন্দরবনে এক লাখ ৩৬ হাজার ৬০৪টি চিত্রা হরিণের অস্তিত্বের তথ্য পাওয়া যায়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, বর্ষার পর্যাপ্ত বৃষ্টিতে উজান থেকে আসা মিঠাপানির প্রবাহ বাড়ায় বনের নদী ও খালের লবণাক্ততা কমেছে। এতে বনের পরিবেশ আরও প্রাণবন্ত হয়েছে। বনরক্ষীদের পর্যবেক্ষণ এবং বনের বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত ক্যামেরাতেও বাঘ ও হরিণের স্বাভাবিক বিচরণের চিত্র ধরা পড়ছে।
গত ১৫ জুলাই বিকেলে সুন্দরবনের একটি নদী একসঙ্গে তিনটি বাঘকে পার হতে দেখেন টহল দলের সদস্যরা। পরে ২৪ জুলাই আন্ধারমানিক বন কার্যালয় এলাকায় একটি বাঘের চলাচল দেখা যায়। ২৬ জুলাই শরণখোলা রেঞ্জের কচিখালী অভয়ারণ্যের টাইগার পয়েন্ট এলাকায় আরেকটি বাঘকে সাঁতরে নদী পার হতে দেখা যায়। ঘটনাটির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে।
সম্প্রতি আন্ধারমানিক ও হাড়বাড়িয়া এলাকায় বনের ভেতরে অতিরিক্ত ক্যামেরা স্থাপন করেছে বন বিভাগ। হরিণ শিকারিদের ফাঁদে আহত হয়ে চিকিৎসা শেষে বনে অবমুক্ত করা একটি বাঘিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি বন্যপ্রাণীর চলাচল নজরদারির জন্য এসব ক্যামেরা বসানো হয়েছে। গত ১৩ জুলাই ক্যামেরা স্থাপনের পর ১৪ ও ২৪ জুলাই সেখানে তিনটি বাঘের উপস্থিতি ধরা পড়ে।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, জুন থেকে আগস্ট সময়টি সুন্দরবনের নদী-খালের মাছ এবং বন্যপ্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ প্রজনন মৌসুম। এ কারণে ২০২১ সাল থেকে প্রতি বছর ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে সব ধরনের প্রবেশ বন্ধ রাখা হচ্ছে।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, বনে হরিণের সংখ্যা বাড়লে বাঘের বিচরণও বাড়ে। গত এক বছরে বন পাহারায় ফুট ট্রেইল কার্যক্রম জোরদার করায় বিপুল পরিমাণ হরিণ শিকারের ফাঁদ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু মালা ফাঁদই উদ্ধার হয়েছে প্রায় এক লাখ ১৪ হাজার ফুট।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. এম. এ. আজিজ বলেন, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বন মানুষের প্রবেশমুক্ত রাখলে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক জীবনযাপন ও প্রজননের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়। তাঁর মতে, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের স্বার্থে প্রতিবছর নির্দিষ্ট সময় সুন্দরবন বন্ধ রাখার এ ব্যবস্থা অব্যাহত রাখা উচিত।
Leave a comment