Home আন্তর্জাতিক কোলাহল থেমে মৃত শহরে পরিণত হয়েছে তেহরান
আন্তর্জাতিক

কোলাহল থেমে মৃত শহরে পরিণত হয়েছে তেহরান

Share
Share

ইরানের রাজধানী তেহরান—যে শহর একসময় ছিল ইতিহাস, সংস্কৃতি ও প্রাণচাঞ্চল্যের প্রতীক—আজ তা পরিণত হয়েছে ভয়, নিস্তব্ধতা ও অনিশ্চয়তার এক ‘মৃত নগরীতে। ইরান ও পশ্চিমা শক্তিগুলোর মধ্যে চলমান সংঘাতের ১৯তম দিনে শহরটির প্রতিটি মুহূর্ত যেন অজানা আতঙ্কে মোড়ানো।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসির সংগ্রহ করা ভিডিওচিত্র ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে এক বিধ্বস্ত নগরীর বাস্তব চিত্র, যেখানে প্রতিদিনের জীবনযাত্রা এখন যুদ্ধের ছায়ায় বন্দি।

রাতের নীরবতা ভেঙে আসে আতঙ্ক-তেহরানের রাত এখন আর নিস্তব্ধতার প্রতীক নয়; বরং সেটি হয়ে উঠেছে আসন্ন বিপদের সংকেত। গভীর রাতে হঠাৎ কুকুরের চিৎকার—স্থানীয়দের কাছে এটি যেন অশনি সংকেত। এর কিছুক্ষণ পরই শোনা যায় যুদ্ধবিমানের গর্জন, এরপর আকাশজুড়ে আগুনের গোলা এবং বিস্ফোরণের তীব্র শব্দ।এই পুনরাবৃত্ত দৃশ্য তেহরানবাসীর মানসিক অবস্থাকে চরমভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। শহরের বাসিন্দারা জানেন না কখন, কোথায়, কীভাবে পরবর্তী হামলা আসবে।

‘ঘরের বাইরে পা রাখা মানেই জীবনের ঝুঁকি’-বারান (ছদ্মনাম), তেহরানের একজন তরুণ ব্যবসায়ী, বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ড্রোন হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে বাইরে বের হওয়া কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

তার ভাষায়,“বাইরে পা রাখা মানেই নিজের জীবন নিয়ে জুয়া খেলা। কখন কী ঘটে যাবে, কেউ জানে না। এমনকি যখন কোনো শব্দ থাকে না, সেই নীরবতাও আমাদের কাছে ভয়ের হয়ে ওঠে।”

তার এই অভিজ্ঞতা একক নয়; বরং এটি হাজারো তরুণ ইরানির বাস্তবতা। যারা একসময় ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন, তারা এখন কেবল বেঁচে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত।
ভেঙে পড়া স্বপ্ন, থমকে থাকা প্রতিবাদ-গত জানুয়ারিতে সরকারবিরোধী আন্দোলন কঠোরভাবে দমন করার পর থেকেই অনেক তরুণের আশা-আকাঙ্ক্ষা ভেঙে পড়ে। বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি সেই হতাশাকে আরও গভীর করেছে।এখন তারা এক অদ্ভুত বাস্তবতায় আটকে পড়েছে—না পারছে প্রতিবাদ করতে, না পারছে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও যুদ্ধের চাপ একত্রে তাদের জীবনকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

নিরাপত্তা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে শহর-তেহরানের রাস্তাঘাটে এখন সাধারণ মানুষের চেয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতিই বেশি চোখে পড়ে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে মোড়ে স্থাপন করা হয়েছে চেকপয়েন্ট। মুখোশ পরা সশস্ত্র সদস্যরা চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে।

এতে করে শহরবাসীর মধ্যে তৈরি হয়েছে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি। অনেকেই মনে করছেন, তারা যেন নিজেদের শহরেই পরবাসী হয়ে পড়েছেন।

‘এটি আর আমাদের শহর নয়’-আলী (ছদ্মনাম), একজন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত নাগরিক বলেন, তেহরান এখন আর আগের মতো নেই।“রাস্তায় যাদের দেখি, তারা আমাদের কেউ নয়। তারা সবাই সরকারের লোক। মনে হয় আমাদের কাছ থেকে আমাদের শহরটা কেড়ে নেওয়া হয়েছে।”
নিজেকে মানসিকভাবে স্থির রাখতে তাকে নিয়মিত বিষণ্নতা প্রতিরোধী ওষুধ গ্রহণ করতে হচ্ছে। এটি শুধু আলীর গল্প নয়; বরং বহু নাগরিকের অভিজ্ঞতা। তেহরানবাসীর মন এখন দ্বিধায় বিভক্ত। একদিকে তারা বর্তমান শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন চান, অন্যদিকে বিদেশি হামলার ভয়াবহতাও প্রত্যাখ্যান করেন।

আলী বলেন,“আমাদের আকাশ এখন শত্রুর নিয়ন্ত্রণে। তবুও মনে এক কোণে আশা আছে—হয়তো এই সংকট বড় কোনো পরিবর্তনের পথ খুলে দেবে।” এই মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বই বর্তমান তেহরানের সামাজিক বাস্তবতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

‘তারার নিচে নয়, রকেটের নিচে ঘুম’-বারানের কথায় যুদ্ধের ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি বলেন,“পৃথিবীর অন্য দেশে মানুষ রাতে তারার নিচে ঘুমায়, আর আমরা ঘুমাই রকেটের নিচে। আলো দুই জায়গাতেই আছে, কিন্তু সেই আলোর অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন।” এই সংক্ষিপ্ত বক্তব্যই যেন যুদ্ধবিধ্বস্ত তেহরানের জীবনের গভীরতম বাস্তবতাকে তুলে ধরে।

মানসিক ক্ষতের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব-বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত যদি শিগগিরই শেষও হয়, তবুও এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হবে। যুদ্ধের ফলে যে মানসিক আঘাত তৈরি হচ্ছে, তা কাটিয়ে উঠতে একাধিক প্রজন্ম সময় লাগতে পারে। শিশুদের বেড়ে ওঠা, তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য, এবং সামাজিক কাঠামো—সবকিছুতেই এই যুদ্ধের গভীর প্রভাব পড়বে।

যুদ্ধ এখন ঘরে ঘরে-বর্তমান পরিস্থিতিতে যুদ্ধ আর কেবল সীমান্তে সীমাবদ্ধ নেই। এটি ছড়িয়ে পড়েছে তেহরানের প্রতিটি ঘরে, প্রতিটি পরিবারের দৈনন্দিন জীবনে। প্রতিটি বিস্ফোরণ, প্রতিটি ড্রোন হামলা, প্রতিটি আতঙ্ক—সবকিছু মিলে যুদ্ধ এখন মানুষের মানসিক জগতে স্থায়ীভাবে জায়গা করে নিয়েছে।

ইতিহাসের শহর, ধ্বংসের সাক্ষী-প্রায় ছয় হাজার বছরের ঐতিহ্য বহনকারী তেহরান আজ এক ভিন্ন বাস্তবতার সাক্ষী। ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আধুনিকতার সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা এই শহরটি এখন ধ্বংসস্তূপ, আতঙ্ক এবং দীর্ঘশ্বাসের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যুদ্ধের এই অধ্যায় কবে শেষ হবে, তা অনিশ্চিত। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়—তেহরান আর আগের মতো থাকবে না। শহরটির প্রতিটি দেয়াল, প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি মানুষের মনে এই সময়ের স্মৃতি দীর্ঘদিন ধরে রয়ে যাবে।
তথ্যসূত্র: বিসিবি

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Don't Miss

ড. ইউনূসের এক বছরে ৪৯৬ সাংবাদিক নির্যাতন, জামিন পাচ্ছেন না অনেকেই

২৪-এর ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী সরকারের পতনের হলে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। এর পর থেকেই শুরু হয় সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার, হয়রানি...

অস্ট্রিয়ায় শিশুখাদ্যে বিষ মিশিয়ে ব্ল্যাকমেইল, অভিযুক্ত গ্রেফতার

শিশুখাদ্যে প্রাণঘাতী বিষ মিশিয়ে একটি বহুজাতিক কোম্পানিকে ব্ল্যাকমেইল করার চাঞ্চল্যকর ঘটনায় অস্ট্রিয়ায় ৩৯ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গত মাসে নামী...

Related Articles

প্রবীণ সিপিএম নেতাকে হারিয়ে ইতিহাস গড়লেন হিজাবধারী ফাতেমা

কেরালার রাজনীতিতে এক বড় চমক সৃষ্টি করে বামপন্থীদের শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত...

হরমুজ প্রণালির ‘একচ্ছত্র রক্ষক’ ইরান

মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে...

২০৮ প্রবাসী জুলাই যোদ্ধাকে ২৫ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিতে রুল জারি

জুলাই আন্দোলনে ভূমিকার রাখার কারণে প্রবাসে কারা নির্যাতন ভোগ করে দেশে ফিরে...

পশ্চিমবঙ্গে মমতার দেড় দশকের সাম্রাজ্যের পতন: বিজেপির ‘বঙ্গজয়

দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্রে অপ্রতিরোধ্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘মা,...