সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার পরিচালনায় একটি প্রভাবশালী ‘কিচেন কেবিনেট’ সক্রিয় ছিল উল্লেখ করে নিজে সেই অভ্যন্তরীণ চক্রের সদস্য ছিলেন না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন ওই সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অন্যতম শীর্ষ নেতা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। গত মঙ্গলবার (২৬ মে) বিকেলে রাজধানীর বাংলামোটরে দলের অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই দাবি করেন।
সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিকের সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের জবাবে আসিফ মাহমুদ বলেন, “আমিও স্পষ্ট করেই বলেছি যে, সাবেক সরকারে একটি কিচেন কেবিনেট ছিল; কিন্তু আমি কোনোভাবেই সেটার সদস্য ছিলাম না।” এছাড়া, জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে বহুল আলোচিত বাণিজ্য চুক্তি সই করেছিল, সে বিষয়ে এনসিপির কোনো মতামত বা সম্মতি নেওয়া হয়নি বলেও দলের এই মুখপাত্র অভিযোগ করেন।
রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিভাষায় ‘কিচেন কেবিনেট’ বলতে আনুষ্ঠানিক কোনো ফোরামকে বোঝায় না। সাধারণত রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানের অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ কিছু সহকর্মী নিয়ে গঠিতঅগোচরে থাকা একচেটিয়া গোষ্ঠীকে ‘কিচেন কেবিনেট’ বলা হয়, যা সরকারের নীতিনির্ধারণী ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে মূল ভূমিকা পালন করে। সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এই গোপন ফোরামের বিষয়টি প্রথম প্রকাশ্যে আনেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। তিনি দাবি করেছিলেন, সাত সদস্যের একটি ‘কিচেন কেবিনেট’ প্রতি মঙ্গলবার তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনায় বৈঠকে বসত এবং মন্ত্রণালয়ের কাজে তাদের অতি-হস্তক্ষেপের কারণে তিনি তিনবার পদত্যাগের সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলে শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। সেই সরকারে ছাত্র-তরুণদের প্রতিনিধি হিসেবে আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া উপদেষ্টার শপথ নেন। শুরুতে তিনি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেলেও পরবর্তীতে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার গুরুদায়িত্ব পালন করেন।
মঙ্গলবারের সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সই হওয়া বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে সাবেক এই উপদেষ্টা বর্তমান রাজনৈতিক দলগুলোর তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “আমরা মনে করি, এই চুক্তিটির রূপরেখা মূলত বিএনপিই তৈরি করেছে। কিন্তু সংসদ নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে তাদেরই বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে (খলিলুর রহমান) দিয়ে এটি অন্তর্বর্তী সরকারের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন এটি নিয়ে একটি নোংরা রাজনৈতিক ‘ব্লেম গেম’ বা কাদা ছোড়াছুড়ি চলছে।”
আসিফ মাহমুদ ক্ষোভ প্রকাশ করে আরও বলেন, “অনেকেই দাবি করছেন বাণিজ্য চুক্তি সম্পর্কে সব রাজনৈতিক দলকে আগে থেকেই অবহিত করা হয়েছিল। তবে আমি আমাদের দলের আহ্বায়কসহ সবার সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হয়েছি, চুক্তির বিষয়ে কেউ এনসিপির কোনো ‘কনসার্ন’ বা মতামত নেয়নি।” তিনি বর্তমান সরকারের উদ্দেশ্যে আহ্বান জানিয়ে বলেন, “চুক্তি করেছেন বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। যদি এতে দেশের কোনো ক্ষতি হয়, তবে আপনারা এই চুক্তি পর্যালোচনা করুন, প্রয়োজন হলে বাতিল করুন। চুক্তির যে অংশগুলো বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী, তা সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় আলোচনা করুন। কিন্তু সব দায় অন্তর্বর্তী সরকার, এনসিপি বা জামায়াতের ওপর চাপানোর এই বিভ্রান্তিকর রাজনীতি বন্ধ করতে হবে।”
সংবাদ সম্মেলনে এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, আলাউদ্দীন মোহাম্মদ ও এস এম সাইফ মোস্তাফিজসহ দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
Leave a comment