তুলা আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং দেশের বস্ত্র ও পোশাকশিল্পের কাঁচামালের জোগান শক্তিশালী করতে ২০৫০ সালের মধ্যে দেশীয় তুলার আঁশ উৎপাদন ১৯ লাখ গাঁটে উন্নীত করার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।
বর্তমানে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ২ লাখ ২৪ হাজার গাঁট তুলার আঁশ উৎপাদিত হয়, যা দেশের বস্ত্রশিল্পের মোট চাহিদার প্রায় ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ পূরণ করে। সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে উৎপাদন ৫ লাখ গাঁটে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে ১৯ লাখ গাঁটে উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
শনিবার (২৫ জুলাই) তুলা উন্নয়ন বোর্ডের (সিডিবি) উপপরিচালক কুতুব উদ্দিন বলেন, উন্নত ও হাইব্রিড জাতের তুলা উদ্ভাবন, চাষের আওতা বৃদ্ধি এবং কৃষকদের ধারাবাহিক প্রণোদনার মাধ্যমে এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।
তিনি বলেন, উপযুক্ত জমির ব্যবহার এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির মাধ্যমে তুলার ফলন বাড়ানোর যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। উৎপাদন বাড়লে আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে এবং দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের সরবরাহব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে।
তুলা উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রায় ৪৫ হাজার হেক্টর জমিতে তুলার চাষ হয়। তবে প্রায় ২ লাখ হেক্টর জমিতে এ ফসল চাষের সম্ভাবনা রয়েছে। চরাঞ্চল, রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চল এবং পাহাড়ি এলাকার খাদ্যশস্য উৎপাদনের অনুপযোগী জমিতে তুলা চাষ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। কর্মকর্তাদের মতে, এতে খাদ্যনিরাপত্তা বিঘ্নিত না করেই তুলার উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে।
বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পে বছরে প্রায় ৯০ লাখ গাঁট কাঁচা তুলার প্রয়োজন হয়। এ কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বড় তুলা আমদানিকারক দেশ। বর্তমানে বছরে প্রায় ৭৩ থেকে ৮০ লাখ গাঁট কাঁচা তুলা আমদানি করতে হয়।
২০২৫–২৬ অর্থবছরে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে প্রায় ৭৩ লাখ গাঁট কাঁচা তুলা আমদানি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, শুধু ২০৩০ সালের মধ্যে তুলার আঁশ উৎপাদন ৫ লাখ গাঁটে উন্নীত করা গেলেই বছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় সম্ভব।
লক্ষ্য অর্জনে সরকার তুলা চাষিদের প্রণোদনা, ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচির আওতায় অন্তর্ভুক্তকরণ এবং কার্বন ট্রেডিং উদ্যোগের মাধ্যমে ঋণসুবিধা সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে।
বর্তমানে তুলা উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৪০তম। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল ও পাকিস্তান বিশ্বে তুলা উৎপাদনে শীর্ষে রয়েছে।
তুলা শুধু বস্ত্রশিল্পের প্রধান কাঁচামাল নয়, এর বীজ থেকে ভোজ্যতেল উৎপাদন এবং খৈল পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ফলে ফসলটির অর্থনৈতিক গুরুত্বও অনেক বেশি।
তুলা উন্নয়ন বোর্ডের উপপরিচালক ড. মো. তাসদিকুর রহমান বলেন, নীতিগত সীমাবদ্ধতা, দীর্ঘ উৎপাদনকাল, অন্যান্য লাভজনক ফসলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, চাষযোগ্য জমির সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দামের ওঠানামা এবং কীটপতঙ্গের আক্রমণ তুলা চাষের বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি বলেন, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজন শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সরকারের ধারাবাহিক বিনিয়োগ।
সরকার ইতিমধ্যে তুলা উন্নয়ন বোর্ডকে শক্তিশালী করা, অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং পরিবেশবান্ধব বস্ত্রশিল্পে সহায়তাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি তুলা চাষের এলাকা বৃদ্ধি, সাংগঠনিক সংস্কার, মূল্য ভর্তুকি এবং বিশেষ কৃষিঋণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
২০২৬–২৭ অর্থবছরে তুলা চাষে প্রণোদনা হিসেবে ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় ২৬টি জেলার প্রায় ২৫ হাজার প্রান্তিক কৃষক এক বিঘা জমিতে আন্তঃফসল হিসেবে তুলা চাষের জন্য উন্নত বীজ, সার ও কীটনাশক পাবেন।
তুলা উন্নয়ন বোর্ডের মৃত্তিকা উর্বরতা ও পানি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ড. এম গাজী গোলাম মুর্তুজা বলেন, উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে কৃষকের লাভ বাড়ানোই এ প্রণোদনার মূল উদ্দেশ্য। তাঁর মতে, পাট চাষ কমে যাওয়ায় তুলা এখন অন্যতম সম্ভাবনাময় অর্থকরী ফসলে পরিণত হয়েছে।
সিডিবির নির্বাহী পরিচালক মো. রেজাউল আমিন বলেন, এক বিঘা জমিতে তুলা চাষে গড়ে প্রায় ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়। সেখান থেকে প্রায় ১৫ মণ কাঁচা তুলা উৎপাদন করে কৃষক প্রায় ৬০ হাজার টাকা আয় করতে পারেন।
তিনি বলেন, দেশে উৎপাদিত প্রতি কেজি তুলা সরকারের প্রায় ৪ মার্কিন ডলার আমদানি ব্যয় সাশ্রয় করে। ফলে স্থানীয় উৎপাদন কৃষক ও জাতীয় অর্থনীতি—উভয়ের জন্যই লাভজনক।
সাধারণত জুনের মাঝামাঝি সময়ে তুলার বীজ বপন করা হয় এবং ডিসেম্বর থেকে ফসল সংগ্রহ শুরু হয়। বিজ্ঞানীদের মতে, উন্নত বীজ, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি এবং জিনগতভাবে উন্নত তুলার জাত উদ্ভাবনের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা আরও বাড়ানো সম্ভব।
তাঁদের মতে, বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও জলবায়ুগত পরিবেশ তুলা চাষের জন্য অনুকূল। বিশেষ করে দেশের দক্ষিণ, পশ্চিম, উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের ৩২টির বেশি জেলার উঁচু ও পাহাড়ি এলাকায় এ ফসলের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন, সরকারের ধারাবাহিক সহায়তা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কৃষকদের অংশগ্রহণ বাড়লে আগামী কয়েক দশকে দেশীয় তুলা উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। এতে আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং দেশের বস্ত্র ও পোশাকশিল্প আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে।
Leave a comment