যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বখ্যাত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার সুবর্ণ সুযোগ পাওয়ার স্বপ্ন এক মর্মান্তিক ট্র্যাজেডিতে রূপ নিয়েছে। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের একটি সাধারণ পরিবারের এই স্বপ্ন পূরণের পথে প্রতারণার ফাঁদ পেতে সর্বস্ব লুটে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। মেধাবী এক তরুণীকে হার্ভার্ডে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে লাখ লাখ পাকিস্তানি রুপি আত্মসাৎ করার পর এই জালিয়াতি প্রকাশ পেলে ভেঙে পড়েন ওই তরুণী। ফলশ্রুতিতে চরম মানসিক বিপর্যস্ততায় নিজ জীবন বিসর্জন দিতে বাধ্য হন তিনি। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গণমাধ্যম ‘আল-জাজিরা’য় প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি প্রকাশ্যে এসেছে।
নিহত ওই তরুণীর নাম লাইবা ইজাজ (২৪)। তিনি আন্তর্জাতিক ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় ইসলামাবাদ (আইআইইউআই) থেকে পদার্থবিজ্ঞানে অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে স্বর্ণপদক অর্জন করেছিলেন। পুলিশ ও সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, গত ৯ অক্টোবর ইসলামাবাদের জি-১০ এলাকার নিজ বাসার কাছ থেকেই লাইবার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তের ধারণা অনুযায়ী, ভয়াবহ প্রতারণার শিকার হয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার কারণে তিনি আত্মহত্যা করেছেন। তবে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত এখনও অব্যাহত রয়েছে। চাঞ্চল্যকর এই প্রতারণার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত মুহাম্মদ নোমানকে গত ১১ অক্টোবর গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। পরবর্তীতে ২০ অক্টোবর পুলিশি হেফাজতে থাকা অবস্থায় সহযোগীদের ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টার সময় সংঘটিত গুলিবিনিময়ে নোমানের মৃত্যু হয়।
এর পরদিন ২১ অক্টোবর পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি লাইবার শোকাহত পরিবারের সঙ্গে সরাসরি দেখা করেন। এ সময় উদ্ধারকৃত অর্থের মধ্যে পাঁচ লাখ নয়, বরং ৫০ লাখের বেশি পাকিস্তানি রুপি আনুষ্ঠানিকভাবে পরিবারের হাতে হস্তান্তর করা হয়। তবে অর্থের এই পরিমাণ শোকাচ্ছন্ন পরিবারের কাছে মেয়েকে হারানোর বেদনার কাছে অত্যন্ত ম্লান। লাইবার বাবা রানা মুহাম্মদ ইজাজ ইসলামাবাদের জি-১০ এলাকায় একটি সাধারণ দুগ্ধজাত পণ্যের দোকান চালান এবং দোকানের ওপরের ছোট অ্যাপার্টমেন্টেই তাঁদের তিন দশকের বেশি সময় ধরে বসবাস। আল-জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অশ্রুসিক্ত নয়নে ইজাজ জানান, প্রতিদিন সকালে ও রাতে চা বানিয়ে দেওয়া এবং ঘুমাতে যাওয়ার আগে বাবার কাঁধ মালিশ করে দেওয়ার মতো ছোট্ট স্মৃতির টুকরোগুলোই আজ তাঁকে সবচেয়ে বেশি কাঁদায়।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, ইজাজের পড়াশোনা কেবল অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত এবং তাঁর স্ত্রী পড়েছেন দশম শ্রেণি পর্যন্ত। তা সত্ত্বেও তাঁরা অত্যন্ত কষ্ট করে নিজেদের চার মেয়েকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষিত করেছেন। লাইবা ছাড়াও তাঁর অন্য বোনেরাও উচ্চশিক্ষা অর্জন করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে স্বর্ণপদক অর্জনের সেই আনন্দের দিনে লাইবা ছোট বোনদের সামনে আনন্দে নেচে উঠেছিলেন। ইসলামাবাদের একটি স্কুলে বিজ্ঞান পড়ানোর পাশাপাশি তিনি ছোট শিশুদের প্রাইভেট পড়াতেন। সৌদি আরব থেকে উচ্চশিক্ষার বৃত্তির সুযোগ পেলেও তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করা। বাবার কাছে আকুল আবেদন জানিয়ে লাইবা বলেছিলেন, নিজের পড়াশোনা তিনি নিজেই চালিয়েছেন, এবার বাবা যেন তাঁর উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণে পাশে দাঁড়ান। স্নেহাসিক্ত বাবাও মেয়েকে সাধ্যমতো সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
যেভাবে পাতা হয়েছিল প্রতারণার ফাঁদ:
চলতি বছরের শুরুর দিকে ইসলামাবাদের একটি কল সেন্টারে কাজের সুবাদে অভিযুক্ত নোমানের সঙ্গে লাইবার পরিচয় হয়। পরবর্তীতে নোমান ইজাজের দোকানে নিয়মিত যাতায়াত করতে শুরু করেন এবং লাইবার উচ্চশিক্ষার উচ্চাকাঙ্ক্ষার কথা জানতে পারেন। নিজেকে সুপ্রিম কোর্টের কর্মচারী হিসেবে পরিচয় দিয়ে নোমান একটি ভুয়া সার্ভিস কার্ড প্রদর্শন করেন। এরপর তিনি লাইবার বিশ্ববিদ্যালয় আবেদনপত্র ও কাগজপত্র তৈরির দায়িত্ব নেন। পরিবারের সরলতার সুযোগ নিয়ে প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয় ফি বাবদ ২২ লাখ রুপি এবং পরে হার্ভার্ডে ভর্তির ব্যাংক সচ্ছলতার প্রমাণ দেখাতে আরও ৭২ লাখ রুপির সমপরিমাণ অর্থ ডলারে রূপান্তরের নামে হাতিয়ে নেন। মেয়ের স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে ইজাজ শেষ সম্বল নিজের জমি ও পরিবারের গয়না পর্যন্ত বিক্রি করে দেন।
আল-জাজিরার হাতে আসা নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রতারক চক্রটি অত্যন্ত সুকৌশলে লাইবার নামে হার্ভার্ডের ভুয়া ভর্তি ও বৃত্তির চিঠি, যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ফরম, স্পনসরশিপ হলফনামা এবং বোস্টনগামী বিজনেস ক্লাসের জাল বিমান টিকিট প্রস্তুত করেছিল। সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে সর্বশেষ ফাইলে ১২ অক্টোবরের ভিসা সাক্ষাৎকারের তারিখ দেখে পরিবার আনন্দিত হলেও অক্টোবরের শুরুতে সন্দেহ হওয়ায় তাঁরা একটি ট্রাভেল এজেন্সি ও আইনজীবীর শরণাপন্ন হন। তখনই বেরিয়ে আসে মূল সত্য—নথিগুলোর প্রতিটিই ছিল সম্পূর্ণ জাল।
সবকিছু জানার পরও লাইবা আশা ছাড়েননি; তিনি বিশ্বাস করতেন মার্কিন কর্তৃপক্ষ হয়তো সত্যটা উপলব্ধি করবে। কিন্তু গত ৯ অক্টোবর দুপুরের দিকে বাবার নিষেধ উপেক্ষা করে তিনি বাসা থেকে বের হন এবং বাড়ি ফেরার দুই ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে মর্মান্তিক পরিণতি বরণ করেন। প্রিয় সন্তানের এই অকালমৃত্যু কেবল একটি পরিবারের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ও সঞ্চয়ই কেড়ে নেয়নি, বরং বিদেশে উচ্চশিক্ষার মোহ দেখিয়ে প্রতারণাকারীদের বিরুদ্ধে সমাজে এক কঠিন ও নতুন সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছে।
Leave a comment