প্রতিবেশীদের টিটকারি আর উপহাসকে শক্তিতে রূপান্তর করে পড়াশোনায় এক অবিশ্বাস্য ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ৩০ বছর বয়সী রীতি খাতুন। সংসার, সন্তান ও পরিবারের নানা দায়িত্বের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে দীর্ঘ চৌদ্দ বছর শিক্ষাজীবন থেকে দূরে থাকার পর তিনি আবারও কলম ধরেছিলেন হাতে। আর সেই অদম্য জেদ ও কঠোর পরিশ্রমের সুফল হিসেবে ২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষায় বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা (বিএম) শাখা থেকে সর্বোচ্চ ফল জিপিএ-৫ অর্জন করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন পুরো এলাকায়।
অদম্য মেধাবী এই নারী জয়পুরহাট জেলার ক্ষেতলাল উপজেলার নসিরপুর গ্রামের আব্দুল আলিম মণ্ডলের স্ত্রী। তিনি ক্ষেতলাল পাইলট বালিকা স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিএম শাখা থেকে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিলেন।
জানা যায়, রীতি খাতুন ২০১০ সালে মোলামগাড়িহাট দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয় থেকে সফলভাবে এসএসসি পাস করেছিলেন। এর ঠিক পরের বছরই, অর্থাৎ ২০১১ সালে পারিবারিকভাবে তার বিয়ে হয় এবং কোলজুড়ে আসে কন্যাসন্তান। স্বামী, সংসার ও সন্তানের দায়িত্বের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়েও মনের কোণে সুপ্ত থাকা পড়াশোনার স্বপ্নটাকে তিনি হারিয়ে যেতে দেননি। অবশেষে দীর্ঘ বিরতির পর সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে এসএসসি পাসের প্রায় চৌদ্দ বছর পর, ২০২৪ সালে এসে আবারও নতুন করে কলেজে ভর্তি হন তিনি।
তবে দীর্ঘদিন পর নতুন করে পড়াশোনা শুরু করার এই পথটি মোটেও সহজ ছিল না। দিনের পুরো সময়টা তাকে ব্যস্ত থাকতে হতো রান্নাবান্না, ঘরগৃহস্থালির কাজ এবং পরিবার সামলানোর কাজে। এসব ব্যস্ততা সামলানোর পর পড়াশোনার জন্য তাকে বেছে নিতে হতো গভীর রাত। যখন চারপাশ নিঝুম, তখন ক্লান্ত শরীর নিয়ে মোবাইল ফোনের মিটমিটে আলোয় কিংবা টেবিল ল্যাম্পের আলো জ্বেলে ভোর পর্যন্ত চালিয়ে গেছেন নিজের অধ্যাবসায় ও পড়াশোনা। এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় আশেপাশের মানুষের নানা কটূক্তি ও উপহাস শুনতে হলেও সেসব নেতিবাচক কথা তার মনোবলে ফাটল ধরাতে পারেনি।
রীতির এই অদম্য যাত্রায় তার সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা ছিলেন তার স্বামী আব্দুল আলিম মণ্ডল বাবু। স্ত্রীর পড়াশোনার প্রতি প্রবল আগ্রহ দেখে তিনি তাকে সাহস জুগিয়ে কলেজে ভর্তি করান। এছাড়া শিক্ষকসমাজ ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের আন্তরিক উৎসাহ তাকে প্রতিটি মুহূর্তে সামনে এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে।
নিজের অনুভূতির কথা প্রকাশ করে রীতি খাতুন আবেগাপ্লুত কণ্ঠে জানান, স্বামীর আন্তরিক সহযোগিতা ও মানসিক জোর ছিল বলেই তিনি এই বয়সে এসে আবার পড়াশোনা করার সুযোগ পেয়েছেন। তিনি আগামী দিনে উচ্চশিক্ষার পথ ধরে আরও এগিয়ে যাওয়ার জন্য সবার কাছে দোয়া প্রার্থনা করেছেন।
রীতির শ্বশুর সাইদুর রহমান আনন্দিত কণ্ঠে জানান, ঘরের বউ হয়েও সংসারের সব দায়িত্ব নিখুঁতভাবে সামলে যেভাবে তিনি অভাবনীয় ফলাফল করেছেন, তা পুরো পরিবারের জন্য এক বিরাট গৌরবের বিষয়। ক্ষেতলাল পাইলট বালিকা স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ সায়ফুল ইসলাম তার এই সাফল্যের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, একজন সংসারী নারী হয়েও বিরতি ভেঙে যেভাবে তিনি কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন করেছেন, তা বর্তমান সমাজের প্রতিটি নারী ও শিক্ষার্থীর জন্য এক উজ্জ্বল অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।
একসময়ে যে প্রতিবেশীরা তাকে নিয়ে উপহাস করতেন, আজ সেই এলাকার মানুষের মাঝেই বইছে আনন্দের বন্যা। গ্রামের প্রবীণ প্রতিবেশী আবু নাছের মণ্ডল উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে জানান, রীতি খাতুনের এই যুগান্তকারী সাফল্যে পুরো গ্রাম আজ ধন্য ও গর্বিত। গ্রামের সবাই মিলে এই আনন্দ উদ্যাপন করার জন্য বিশেষ আয়োজন করার কথাও জানিয়েছেন তারা।
Leave a comment