জুলাই গণ–অভ্যুত্থানকে শুধু রাজনৈতিক দল বা নেতা–কর্মীদের আন্দোলন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, জুলাই ছিল সর্বস্তরের মানুষের আন্দোলন। রাজনীতির বাইরে থাকা মানুষ, ‘আই হেট পলিটিক্স’ মানসিকতার মানুষ, সুইং ভোটার, শ্রমজীবী ও শিক্ষার্থীসহ নানা শ্রেণি–পেশার মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণেই এই আন্দোলন সফল হয়েছিল। আর সেই মানুষদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতেই তিনি ব্যক্তিগতভাবে বার্তা পাঠিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে এসব কথা বলেন নাহিদ ইসলাম।
স্ট্যাটাসে তিনি লেখেন, ‘সবাইকে জুলাই বিপ্লবের শুভেচ্ছা। শহীদ কর্নেল গুলজার, শহীদ রেহান আহসান, শহীদ আবরার ফাহাদ, শহীদ আবু সাঈদ, শহীদ ওয়াসিম, শহীদ তাহির জামান প্রিয়, শহীদ রিয়া গোপ, শহীদ শরিফ ওসমান হাদীর রক্ত–ঘামে অর্জিত এই আজাদি আশা করি সবাই উপভোগ করছেন।’
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘বেশ কিছুদিন ধরেই একটা বিষয় ভাবছিলাম। জুলাইয়ে আমার জন্য দোয়া করেছিলেন, আমার জন্য স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন, আমার মুক্তির জন্য গান গেয়েছিলেন, ছবি এঁকেছিলেন—এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁদের আমি চিনি না। রাস্তায় পানির বোতল এগিয়ে দেওয়া খুদে ব্যবসায়ী, আহতদের হাসপাতালে নেওয়া রিকশা–ভ্যানচালক, পুলিশের চোখ এড়িয়ে হাসপাতালে আহতদের চিকিৎসা দেওয়া চিকিৎসক—এমন অসংখ্য মানুষ আছেন, যাঁদের আমি চিনি না।’
তিনি আরও লেখেন, ‘যে ছেলেটা প্লেস্টেশন আর ক্রিপ্টোকারেন্সির বাইরে কিছু বোঝে না, যে মেয়েটার জীবন কিয়োশি থেকে ক্রিমসন কাপ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ, যারা কখনো সরকারি চাকরি করার কথা ভাবেনি, বিএএফ শাহীন কলেজের শহীদ আহনাফের মতো যাদের ছাত্ররাজনীতি করারও বয়স হয়নি—সেই ছেলেমেয়েরাই জুলাইয়ে আবাবিল পাখির মতো নেমে এসে আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছে।’
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘কিন্তু জুলাইয়ের পর তাঁদের বেশির ভাগই ঘরে ফিরে গেছেন। তাঁরা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন। অথচ জুলাইকে আমরা রাজনীতিবিদেরা রাজনৈতিক দলের মধ্যে ভাগ–বাঁটোয়ারা করে ফেলেছি। বিএনপির ভাগ কত, এনসিপির ভাগ কত, জামায়াতের ভাগ কত—এভাবেই জুলাইয়ের কৃতিত্ব ভাগাভাগি হয়েছে এবং হচ্ছে। কিন্তু জুলাই তো শুধু রাজনৈতিক দল ও নেতা–কর্মীদের ছিল না। জুলাই ছিল সর্বস্তরের মানুষের। এপলিটিক্যাল জনগোষ্ঠীর, “আই হেট পলিটিক্স” মানসিকতার মানুষের, সুইং ভোটারদের। তাঁদের অংশগ্রহণ ছাড়া জুলাই কখনো সফল হতো না। অথচ এখন তাঁদের মিছিল–মিটিং, সভা–সেমিনার কিংবা সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেও দেখা যায় না।’
স্ট্যাটাসে তিনি জানান, জুলাইয়ের পর খালি হাতে ঘরে ফিরে যাওয়া মানুষদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উপায় নিয়ে ভাবতে গিয়ে গত দুই দিনে তিনি যতটা সম্ভব ব্যক্তিগত বার্তা পাঠিয়েছেন। তবে অনেকের ইনবক্সে বার্তাটি স্প্যাম ফোল্ডারে চলে গেছে কিংবা বার্তা গ্রহণের অপশন বন্ধ থাকায় তাঁদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
তিনি লেখেন, ‘আমার ইচ্ছা বাংলাদেশের ১৬ কোটি বিপ্লবীকেই বার্তা পাঠানো, তাঁদের সঙ্গে করমর্দন করা এবং কৃতজ্ঞতা জানানো। কিন্তু মানবিক সীমাবদ্ধতার কারণে তা সম্ভব নয়। তাই যাঁরা আমার বার্তা পাননি, তাঁদের সবার কাছে আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। তবে নিশ্চিত থাকুন, আমি আপনাদের ভুলে যাইনি।’
নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, ‘জুলাইয়ের পর আমাদের বহু স্বপ্ন এখনো পূরণ হয়নি। আপনাদের প্রত্যাশিত পরিবর্তনও এখনো অনেক দূরে। আমি স্বীকার করছি, আমাদের প্রচেষ্টার সীমাবদ্ধতা ছিল। তবে বিশ্বাস করুন, আমরা চেষ্টা করেছি। বহুমুখী বাধার কারণে অনেক কিছুই অর্জন করতে পারিনি। আমরা আমৃত্যু নতুন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি। আমাদের ওপর আস্থা রাখুন। জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ গড়ে তুলতে যার যার অবস্থান থেকে চেষ্টা করুন। দেশ ও জাতির প্রয়োজনে আবারও সরব হবেন। জুলাইকে বাঁচিয়ে রাখবেন।’
এটি প্রথম আলোর সংবাদভাষা অনুযায়ী সম্পাদনা করা হয়েছে। দীর্ঘ ফেসবুক স্ট্যাটাসের মূল বক্তব্য অক্ষুণ্ন রেখে ভাষা, বানান, বিরামচিহ্ন ও উদ্ধৃতির উপস্থাপনা সাংবাদিকতার রীতিতে পরিমার্জন করা হয়েছে।
Leave a comment