রাজধানীতে সাম্প্রতিক কয়েকটি টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনায় ঢাকার বাইরের শুটারদের সম্পৃক্ততা পাওয়ায় নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, স্থানীয় অপরাধীদের বদলে বিভিন্ন জেলা থেকে ভাড়াটে শুটার এনে হত্যাকাণ্ড চালানো হচ্ছে। ফলে পুলিশের বিদ্যমান তালিকায় এসব অস্ত্রধারীর নাম না থাকায় তাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করতে সময় লাগছে।
পুলিশ সূত্র জানায়, রাজধানীর পরিচিত অস্ত্রধারী ও সন্ত্রাসীদের একটি বড় অংশ গোয়েন্দা নজরদারিতে থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে অপরাধের ধরনে পরিবর্তন এসেছে। রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার এবং ব্যক্তিগত বিরোধকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হামলায় বাইরে থেকে ভাড়া করা শুটার ব্যবহার করা হচ্ছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এসব শুটার নির্ধারিত লক্ষ্য সম্পর্কে আগে রেকি করেন। পরে সুযোগ বুঝে হামলা চালিয়ে দ্রুত ঢাকা ছেড়ে চলে যান। এ কারণে তাদের সম্পর্কে আগে থেকে কোনো তথ্য থাকে না পুলিশের কাছে। ফলে অপরাধ প্রতিরোধের পাশাপাশি হামলার পর সরাসরি জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রযুক্তিনির্ভর তদন্তে জোর
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) ওসমান গণি বলেন, সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় ঢাকার বাইরের শুটারদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। ইতিমধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘ঢাকার ভেতরের হোক বা বাইরের, অপরাধে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।’
তালিকা হালনাগাদের উদ্যোগ
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় শুটার ও ভাড়াটে খুনিদের একটি তালিকা হালনাগাদ করা হয়। তখন ৪০১ জনের নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পর নতুন করে তালিকা হালনাগাদের কাজ চলছে। গ্রেপ্তার ও পলাতক অপরাধীদের তথ্যও এতে যুক্ত করা হচ্ছে।
বর্তমানে ঢাকা মহানগর পুলিশের বিভিন্ন বিভাগে তালিকাভুক্ত শুটার ও পেশাদার খুনির সংখ্যা হলো—মতিঝিল বিভাগে ১০৬ জন, ওয়ারী বিভাগে ৭৩ জন, তেজগাঁও বিভাগে ৬১ জন, মিরপুর বিভাগে ৬০ জন, রমনা বিভাগে ৩৬ জন, লালবাগ বিভাগে ২৪ জন, গুলশান বিভাগে ১৬ জন এবং উত্তরা বিভাগে ১৩ জন।
আলোচিত কয়েকটি ঘটনায় মিলেছে বহিরাগত শুটারের সম্পৃক্ততা
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ জুলাই রাতে রাজধানীর মিরপুর-১৩ এলাকায় কাফরুল থানা যুবদলের সদস্যসচিব হাফিজুল ইসলাম বাবুকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। লক্ষ্যভ্রষ্ট ওই হামলায় যুবদলকর্মী ইউসুফ আলী পারভেজ নিহত হন এবং আহত হন আরও দুজন।
ঘটনাস্থল থেকে অস্ত্রসহ চঞ্চল মোল্লা নামে একজনকে আটক করা হয়। পরে তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তদন্তকারীরা জানতে পারেন, বাবুকে হত্যার উদ্দেশ্যে ঝিনাইদহ থেকে চারজন ভাড়াটে শুটারকে ঢাকায় আনা হয়েছিল। তারা কয়েক দিন এলাকায় অবস্থান করে রেকি চালানোর পর হামলা চালায়। এ ঘটনায় চার শুটারসহ মোট সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এ ছাড়া গত ২৮ এপ্রিল রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও সরাসরি গুলি চালানো ব্যক্তিদের এখনো শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, এ ঘটনায়ও ঢাকার বাইরের শুটার জড়িত থাকতে পারেন।
বিশেষজ্ঞের মত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড সাধারণত এমনভাবে সংঘটিত হয়, যাতে হামলাকারীদের শনাক্ত করা কঠিন হয়।
তিনি বলেন, ঢাকার বাইরে থেকে আসা শুটারদের শনাক্ত করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ ধরনের অপরাধ মোকাবিলায় শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক নয়, সারা দেশের অপরাধীদের সমন্বিত তথ্যভান্ডার তৈরি এবং বিভিন্ন জেলার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
Leave a comment