জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদ ও নির্যাতিতদের স্মরণে ২০২৪ সালের ১ আগস্ট দেশজুড়ে পালিত হয়েছিল ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ’ কর্মসূচি। শহীদদের স্মরণ, জুলাইয়ের গণহত্যার প্রতিবাদ এবং ৯ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ঘোষিত এই কর্মসূচি দেশব্যাপী ব্যাপক সাড়া ফেলে। তবে বহুল আলোচিত এই কর্মসূচির নামটি কে প্রস্তাব করেছিলেন, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই কৌতূহল ছিল।
আন্দোলনের নেতৃত্ব ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য অনুযায়ী, ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ’ এবং ‘মার্চ ফর জাস্টিস’—দুটি কর্মসূচির নামই প্রস্তাব করেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির তৎকালীন সদস্য ও দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের সাবেক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি সাংবাদিক তাওসিফুল ইসলাম। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)-এর সহযোগী সম্পাদক হিসেবে কর্মরত।
যেভাবে ঘোষণা আসে
২০২৪ সালের ৩১ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সহসমন্বয়ক রিফাত রশীদ গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ’ কর্মসূচির ঘোষণা দেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, জুলাইয়ের গণহত্যার আন্তর্জাতিক তদন্ত, জাতিসংঘের মাধ্যমে বিচার এবং শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবি বাস্তবায়নের দাবিতে ১ আগস্ট কর্মসূচিটি পালন করা হবে। আন্দোলনে নিহত শহীদদের স্মরণ এবং আহত ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরার পাশাপাশি তাঁদের পরিবার ও সহপাঠীদের স্মৃতিচারণের আয়োজন করা হবে।
এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতনের বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরতে চিত্রাঙ্কন, গ্রাফিতি, দেয়াললিখন, ফেস্টুন, ডিজিটাল পোর্ট্রেটসহ বিভিন্ন উপস্থাপনা তৈরির আহ্বান জানানো হয়। ক্যাম্পাস ও এলাকাভিত্তিক শিক্ষক-শিক্ষার্থী-জনতার সমাবেশ, গণহত্যা, গণগ্রেপ্তার, হামলা-মামলা, গুম-খুন এবং শিক্ষকদের ওপর হামলার প্রতিবাদে কর্মসূচি পালনের কথাও বলা হয়। পাশাপাশি মৌন মিছিল, মশাল মিছিল, পথনাটক, মঞ্চনাটক ও প্রতিবাদী গানের আসরের মতো সাংস্কৃতিক কর্মসূচির আহ্বান জানানো হয়।
শহীদদের স্মরণে লেখা, ছবি ও অন্যান্য কনটেন্ট #JulyMassacre এবং #RememberingOurHeroes হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে অনলাইন ও অফলাইনে প্রচারেরও আহ্বান জানানো হয়েছিল।
‘মার্চ ফর জাস্টিস’ থেকে ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ’
এর আগে ৩০ জুলাই রাত সোয়া ১১টার দিকে টেলিগ্রামে ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়। ৩১ জুলাই দেশের আদালত, ক্যাম্পাস ও রাজপথে কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানিয়েছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আব্দুল কাদের।
তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি এস এম ফরহাদ বলেন, ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ ও ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ’—দুটি আলোচিত কর্মসূচির নাম নির্ধারণে সাংবাদিক তাওসিফুল ইসলাম সহযোগিতা করেছিলেন। পরে প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নাম দুটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়।
সমন্বয়কের বক্তব্য
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আবু সাদিক কায়েম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ৩০ জুলাই আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চলছিল। সে সময় দেশজুড়ে গণগ্রেপ্তার ও আতঙ্কের পরিবেশ ছিল। পরিস্থিতি বিবেচনায় গণহত্যার বিচার এবং ৯ দফা দাবিকে সামনে রেখে আদালতমুখী কর্মসূচির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তিনি বলেন, এ বিষয়ে সাংবাদিক তাওসিফুল ইসলামের সঙ্গে আলোচনা করে কর্মসূচির নাম প্রস্তাব করতে বলা হয়। তিনি ‘মার্চ ফর জাস্টিস’সহ কয়েকটি নাম প্রস্তাব করেন। সেখান থেকে ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ নামটি চূড়ান্ত করা হয়।
আবু সাদিক কায়েমের ভাষ্য, এরপর ১ আগস্টের কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরু হলে জুলাইয়ের গণহত্যা ও আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে একটি কর্মসূচি আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়। তখন আবারও তাওসিফুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ’ নামটি প্রস্তাব করেন। পরে সেটিই চূড়ান্ত করে কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
তাওসিফুল ইসলামের বক্তব্য
তাওসিফুল ইসলাম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ৩০ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের তৎকালীন সভাপতি আবু সাদিক কায়েম তাঁকে ফোন করে আদালতকেন্দ্রিক কর্মসূচির একটি খসড়া পাঠান এবং নাম প্রস্তাব করতে বলেন। তখন তিনি ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ নামটি প্রস্তাব করেন, যা পরে গৃহীত হয়।
তিনি জানান, পরদিন তিনি দোয়েল চত্বরে ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচি কাভার করেন। সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থী শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করেন। তবে পুলিশ মিছিলের পথ আটকে দেয় এবং শিক্ষার্থীদের হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে দেয়নি। পরে বুয়েটের শিক্ষার্থীরাও কর্মসূচিতে যোগ দেন।
তাওসিফুল ইসলাম আরও বলেন, একই দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের তৎকালীন সেক্রেটারি এস এম ফরহাদ তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং অনলাইনে ছবি ও লেখা প্রকাশের জন্য একটি ভার্চুয়াল কর্মসূচির নাম প্রস্তাব করতে বলেন।
জবাবে তিনি চারটি নাম প্রস্তাব করেন। এর মধ্যে ছিল ‘Remembering Our Heroes’। প্রথমে সংক্ষিপ্ত একটি নাম নিয়ে আলোচনা হলেও পরে তাঁর প্রস্তাবিত ‘Remembering Our Heroes’ নামটিই ১ আগস্টের কর্মসূচির জন্য চূড়ান্ত করা হয়।
তাওসিফুল ইসলামের দাবি, জুলাই অভ্যুত্থানের বিভিন্ন কর্মসূচির পরিকল্পনা, নামকরণ এবং আন্দোলনের বার্তা ছড়িয়ে দিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং বিভিন্ন মহলের সম্মিলিত সম্পৃক্ততার মাধ্যমেই আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়েছিল।
Leave a comment