মাঠের ডান প্রান্ত দিয়ে বল পায়ে ছুটে চলার সময় প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের প্রায় অসহায় দেখায়। গতি, ক্ষিপ্রতা ও আক্রমণাত্মক ফুটবলশৈলী দিয়ে বিশ্ব ফুটবলে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন মরক্কোর তারকা রাইট-ব্যাক আশরাফ হাকিমি।
স্পেনের বিখ্যাত ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদের যুব একাডেমি ‘লা ফাব্রিকা’ থেকে উঠে আসা এই ফুটবলার বর্তমানে ফরাসি ক্লাব প্যারিস সেন্ট জার্মেইনের (পিএসজি) অন্যতম ভরসা। জার্মানির বরুশিয়া ডর্টমুন্ড ও ইতালির ইন্টার মিলানেও সফল সময় কাটিয়েছেন তিনি।
তবে হাকিমির সাফল্যের পেছনে শুধু প্রতিভা নয়, রয়েছে কঠোর অনুশীলন, সুনির্দিষ্ট ফিটনেস পরিকল্পনা এবং নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস।
ম্যাচের আগের প্রস্তুতি
ম্যাচ বা কঠোর অনুশীলনের আগে শরীর প্রস্তুত করতে হাকিমি হালকা জগিং ও দৌড় দিয়ে শুরু করেন। এরপর করেন ডাইনামিক স্ট্রেচিং।
এ সময় তাঁর অনুশীলনে থাকে—
- লেগ সুইং
- হিপ সার্কেল
- হাই নিস
- ওয়াকিং লাঞ্জেস
মূল অনুশীলনে নামার আগে বল নিয়ে ড্রিবলিং, এক পায়ে হার্ডল জাম্প এবং হেডিংয়ের চর্চাও করেন তিনি। এসব অনুশীলন শরীরের নমনীয়তা ও পেশির কার্যকারিতা বাড়াতে সহায়তা করে।
গতির পেছনের বিজ্ঞান
হাকিমির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো দ্রুত গতি বাড়ানো এবং মুহূর্তের মধ্যে দিক পরিবর্তনের সক্ষমতা। এই দক্ষতা ধরে রাখতে তিনি নিয়মিত বিশেষ কিছু ড্রিল অনুশীলন করেন।
এসবের মধ্যে রয়েছে—
- রিঅ্যাকশন ড্রিল
- জিগজ্যাগ স্প্রিন্ট
- ল্যাডার ড্রিল
- সিঙ্গেল-লেগ হপস
ফিটনেস বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের অনুশীলন পায়ের দ্রুত সাড়া দেওয়া পেশিগুলোকে শক্তিশালী করে, যা ফুটবলারদের বিস্ফোরণধর্মী গতি অর্জনে সহায়তা করে।
জিমে নিয়মিত পরিশ্রম
বিশ্বমানের একজন ডিফেন্ডার হওয়ার জন্য শুধু গতি নয়, প্রয়োজন শক্তিশালী ও ভারসাম্যপূর্ণ শরীর। সে লক্ষ্যেই নিয়মিত জিমে অনুশীলন করেন হাকিমি।
তাঁর ওয়েট ট্রেনিংয়ে সাধারণত থাকে—
- বেঞ্চ প্রেস
- চেস্ট ফ্লাই
- শোল্ডার প্রেস
- বাইসেপ ও ট্রাইসেপ কার্ল
- পুশ-আপ
- স্কোয়াট
- লেগ প্রেস
- ডেডলিফট
পাশাপাশি শরীরের কেন্দ্রীয় অংশ বা কোর শক্তিশালী করতে তিনি নিয়মিত করেন—
- ক্রাঞ্চ
- সাইড প্ল্যাঙ্ক
- ভি-আপ
- রাশিয়ান টুইস্ট
এ ছাড়া ভারসাম্য উন্নত করতে বোসু বল ব্যবহার এবং রেজিস্ট্যান্স ট্রেনিংও তাঁর রুটিনের অংশ।
ফিটনেস রুটিনে বক্সিং
ক্রস-ট্রেনিংয়ের অংশ হিসেবে হাকিমি নিয়মিত বক্সিং অনুশীলন করেন। শ্যাডো বক্সিং, হেভি ব্যাগ ওয়ার্ক এবং স্পারিং সেশনের মাধ্যমে তিনি হৃদ্যন্ত্রের সক্ষমতা, সহনশক্তি ও প্রতিক্রিয়ার গতি বাড়ানোর চেষ্টা করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বক্সিং হাত-চোখের সমন্বয় উন্নত করার পাশাপাশি দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখতেও সাহায্য করে।
খাদ্যাভ্যাসে শৃঙ্খলা
হাকিমির ফিটনেসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো তাঁর খাদ্যাভ্যাস। তিনি প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে প্রাকৃতিক ও পুষ্টিকর খাবারের ওপর বেশি গুরুত্ব দেন।
সকালের নাশতায় থাকে—
- ডিম
- হোল-গ্রেইন টোস্ট
- বিভিন্ন ফল
মাঝখানের হালকা খাবারে থাকে—
- গ্রিক ইয়োগার্ট
- কাঠবাদাম বা আখরোট
দুপুরের খাবারে সাধারণত থাকে—
- ব্রাউন রাইস বা কিনোয়া
- গ্রিলড মাছ বা মুরগির মাংস
- সেদ্ধ সবজি
বিকেলের নাশতায় খান ফল, কটেজ চিজ বা উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ স্মুদি।
রাতের খাবারে থাকে—
- চর্বিহীন প্রোটিন
- মিষ্টি আলু বা হোল-গ্রেইন পাস্তা
- সবুজ শাকসবজির সালাদ
পুষ্টি–পরিপূরক
মাঠের পারফরম্যান্স ও দ্রুত পুনরুদ্ধারের জন্য তিনি কিছু পুষ্টি–পরিপূরকও গ্রহণ করেন। এর মধ্যে রয়েছে—
- ক্যালসিয়াম
- মাল্টিভিটামিন
- হুই প্রোটিন
- ওমেগা–৩ ফ্যাটি অ্যাসিড
- বিসিএএ
এসব উপাদান হাড়ের স্বাস্থ্য রক্ষা, পেশির পুনর্গঠন এবং অনুশীলনের পর দ্রুত পুনরুদ্ধারে সহায়তা করে।
তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণা
আশরাফ হাকিমির ক্যারিয়ার দেখায়, প্রতিভার পাশাপাশি সাফল্যের জন্য প্রয়োজন নিয়মানুবর্তিতা ও কঠোর পরিশ্রম। তাঁর মতে, সাফল্যের কোনো শর্টকাট নেই। নিয়মিত অনুশীলন, সুষম খাদ্য এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামই একজন ক্রীড়াবিদকে সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দিতে পারে।
বিশ্ব ফুটবলে হাকিমির উত্থান তাই শুধু একজন তারকা ফুটবলারের গল্প নয়; বরং শৃঙ্খলা, অধ্যবসায় ও আত্মনিবেদনেরও গল্প।
Leave a comment