নাটোরের লালপুর উপজেলায় ঋতুরাজ বসন্তের বিদায়ের পর বৈশাখের রুদ্ররূপ প্রকট হয়ে উঠেছে। গত কয়েকদিন ধরে এ অঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে মাঝারি তাপপ্রবাহ। বুধবার (২২ এপ্রিল) ঈশ্বরদী আবহাওয়া অফিস লালপুরে সর্বোচ্চ ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করেছে। আগুনের হলকার মতো এই তীব্র গরমের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নজিরবিহীন লোডশেডিং। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, দিনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৬ ঘণ্টাই থাকছে না বিদ্যুৎ
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সবথেকে বড় শিকার হচ্ছে চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার্থীরা। তীব্র গরম আর দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় তাদের পরীক্ষার প্রস্তুতি মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। লালপুরের পরীক্ষার্থী প্রান্তিক ইসলাম ও আব্দুল আওয়াল জানায়, দিনের বেশিরভাগ সময় তো বটেই, এমনকি রাতেও পড়ার টেবিলে বসা সম্ভব হচ্ছে না। গত মঙ্গলবার পরীক্ষা চলাকালেও কেন্দ্রে এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না, ফলে ঘর্মাক্ত অবস্থায় পরীক্ষা দিতে হয়েছে তাদের। শিক্ষাবিদদের মতে, এই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংকট শিক্ষার্থীদের ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
কেবল শিক্ষাক্ষেত্র নয়, লোডশেডিংয়ের আঘাত লেগেছে স্থানীয় অর্থনীতিতেও। লালপুরের ওয়ালিয়া গ্রামের গৃহিণী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কাজ ব্যাহত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন বৈদ্যুতিক অটোরিকশা চালকরা। চালক ইনছার আলী আক্ষেপ করে বলেন, “গত রাতে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না, ফলে ব্যাটারি ঠিকমতো চার্জ হয়নি। চার্জ না থাকলে রাস্তায় গাড়ি বের করা যাচ্ছে না, সংসার চালানোই মুশকিল হয়ে পড়েছে।” পোল্ট্রি খামার এবং স্থানীয় ছোট শিল্পগুলোতেও উৎপাদন মুখ থুবড়ে পড়েছে।
নাটোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর লালপুর জোনাল অফিসের তথ্য অনুযায়ী, লোডশেডিংয়ের মূল কারণ চাহিদার তুলনায় অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ সরবরাহ। বুধবার দুপুরে উপজেলায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ২০ মেগাওয়াট, বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া গেছে মাত্র ৭ মেগাওয়াট। গত মঙ্গলবার রাতে পিক আওয়ারে ২৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মিলেছে মাত্র ১৩ মেগাওয়াট।
লালপুর জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) রেজাউল করিম খান বর্তমান পরিস্থিতির সত্যতা স্বীকার করে বলেন, “এটি একটি জাতীয় সমস্যা। জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় আমরা চাহিদার অর্ধেক বিদ্যুৎও পাচ্ছি না। বর্তমানে আটটি ফিডারে পর্যায়ক্রমে দেড় ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের পর এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ করার চেষ্টা করা হচ্ছে, তবে কখনও তাও সম্ভব হচ্ছে না।” এই সংকট কবে নাগাদ কাটবে, সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট আশার বাণী শোনাতে পারেনি পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ।
ঈশ্বরদী আবহাওয়া অফিসের পর্যবেক্ষক নাজমুল হক জানিয়েছেন, বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকায় ভ্যাপসা গরম অনুভূত হচ্ছে বেশি। মাঝারি এই তাপপ্রবাহ আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে। চিকিৎসকরা এই অসহনীয় গরমে পর্যাপ্ত পানি পান করার এবং শিশুদের সাবধানে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন।
বিদ্যুৎহীন দীর্ঘ ১৬ ঘণ্টা আর ৩৮ ডিগ্রির উত্তাপ—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে লালপুরবাসীর জীবন এখন দুর্বিষহ। স্থানীয় সচেতন মহল দ্রুত এই বিদ্যুৎ বিভ্রাট নিরসনে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
Leave a comment