মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকোম) কঠোর নৌ-অবরোধ উপেক্ষা করেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে ইরান। গত ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদের মধ্যে অনুষ্ঠিত সংলাপ ব্যর্থ হওয়ার পর ওয়াশিংটন ইরানের ওপর সর্বাত্মক অবরোধ আরোপ করলেও, এর বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে এখন গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক খ্যাতনামা জ্বালানি অ্যানালিটিক্স সংস্থা ‘ভোরটেক্সা’ (Vortexa) তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানিয়েছে, মার্কিন অবরোধ কার্যকর হওয়ার মাত্র ১০ দিনের মাথায় ইরান প্রায় ১০ লাখ ৭০ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পারস্য উপসাগর হয়ে দেশের বাইরে পাঠাতে সক্ষম হয়েছে। উপগ্রহ চিত্র এবং জাহাজ ট্র্যাকিং ডেটা বিশ্লেষণ করে সংস্থাটি জানিয়েছে, এই সময়ে অন্তত ৩৪টি ইরান-সংযুক্ত ট্যাংকার জাহাজের চলাচল রেকর্ড করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই ৩৪টি যাত্রার মধ্যে ১৯টি ছিল বহির্গামী এবং ১৫টি আগমনী। অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, অন্তত ৬টি বিশালাকার ট্যাংকার পূর্ণমাত্রায় তেলবোঝাই অবস্থায় ইরানি বন্দর ত্যাগ করেছে এবং সফলভাবে আন্তর্জাতিক জলসীমায় প্রবেশ করেছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে সেন্টকোম হরমুজ প্রণালি ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের প্রধান বন্দরগুলোকে লক্ষ্য করে যে অবরোধ জারি করেছিল, তার মূল উদ্দেশ্য ছিল ইরানের অর্থনীতির মেরুদণ্ড—তেল রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া। ইসলামাবাদ সংলাপের ব্যর্থতাকে তেহরানের অনমনীয়তা হিসেবে দেখে ওয়াশিংটন এই কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছিল। কিন্তু ১০ দিনের মাথায় ১০ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল রপ্তানির খবর মার্কিন গোয়েন্দা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য এক বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইরানি তেলের এই গোপন চালান নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে সংশয় দানা বাঁধায় কড়া প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে হোয়াইট হাউস। মার্কিন প্রশাসনের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব স্কট বেসেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) এক বার্তায় কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেন, “মার্কিন অবরোধ চলাকালীন যদি কোনো দেশ ইরানের কাছ থেকে তেল ক্রয় করে এবং তার প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে সেই দেশের বিরুদ্ধেও দ্বিতীয় পর্যায়ের (Secondary Sanctions) কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে।”
যদিও এই তেলের চূড়ান্ত গন্তব্য বা ক্রেতা কারা, সে সম্পর্কে এপি (AP) বা ভোরটেক্সা নিশ্চিত কোনো তথ্য দেয়নি, তবে বিশ্লেষকদের ধারণা—এশীয় কোনো শক্তিশালী অর্থনৈতিক দেশ এই তেলের ক্রেতা হতে পারে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে তেল বিক্রির ‘বিকল্প নেটওয়ার্ক’ গড়ে তুলেছে। তারা প্রায়ই জাহাজের ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখা, গভীর সমুদ্রে তেল স্থানান্তর (Ship-to-Ship Transfer) এবং নামহীন ফ্ল্যাগ ব্যবহার করে নজরদারি এড়িয়ে চলে।
বর্তমান ঘটনা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, মার্কিন সামরিক উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও ইরান তার রপ্তানি চ্যানেলগুলো সচল রাখতে সক্ষম।
এই পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে। যদি মার্কিন অবরোধ এভাবে অকার্যকর প্রমাণিত হয়, তবে তা ওয়াশিংটনের কৌশলগত অবস্থানকে দুর্বল করে দিতে পারে এবং আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
সূত্র: এপি
Leave a comment