মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজ জব্দ করার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে ইরান। বুধবার (২২ এপ্রিল) ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এই অভিযান পরিচালনা করে। এই পদক্ষেপকে তেহরানের পক্ষ থেকে ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী সামরিক ও কৌশলগত হুঁশিয়ারি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আইআরজিসি-র পক্ষ থেকে প্রকাশিত আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, জব্দ করা জাহাজগুলোর মধ্যে রয়েছে পানামার পতাকাবাহী ‘এমএসসি ফ্রান্সেসকা’ (MSC Francesca) এবং লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী ‘ইপামিনোন্দাস’ (Epaminondas)। এছাড়াও ‘ইউফোরিয়া’ (Euphoria) নামক তৃতীয় একটি জাহাজ ইরানি উপকূলে আটকা পড়েছে বলে জানা গেছে।
তেহরানের দাবি, এই জাহাজগুলো আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচল আইন লঙ্ঘন করে এবং প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়াই ইরানি জলসীমায় প্রবেশ করেছিল। আইআরজিসি আরও অভিযোগ করেছে যে, জাহাজগুলো তাদের নেভিগেশন সিস্টেম (AIS) বন্ধ করে বা তথ্য গোপন করে সামুদ্রিক নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছিল। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদসংস্থা ‘তাসনিম’ জানিয়েছে, এই জাহাজগুলো ‘শত্রুপক্ষ’ অর্থাৎ ইসরাইল বা মার্কিন স্বার্থের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকার সন্দেহে জব্দ করা হয়েছে।
এই ঘটনার প্রেক্ষাপট শুরু হয় গত ১৩ এপ্রিল, যখন ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ওপর কঠোর নৌ-অবরোধ আরোপ করে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (CENTCOM) নির্দেশে ইরানি বন্দরগামী বা সেখান থেকে ছেড়ে আসা যেকোনো জাহাজকে বাধা দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপকে ‘জলদস্যুতা’ ও ‘বেআইনি’ হিসেবে অভিহিত করে ইরান পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছিল।
ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, “যদি ইরানের বন্দরগুলো নিরাপদ না থাকে এবং মার্কিন নৌ-অবরোধ অব্যাহত থাকে, তবে পারস্য উপসাগরের কোনো বন্দরই নিরাপদ থাকবে না।”
হরমুজ প্রণালিতে এই অস্থিরতার ফলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক লাফে প্রতি ব্যারেলে ৯৮ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের জ্বালানি কমিশনার সতর্ক করেছেন যে, এই অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে ইউরোপে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ইউরোর আর্থিক ক্ষতি হবে।
জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের এই ‘ইঁদুর-বেড়াল’ খেলা যেকোনো মুহূর্তে পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
বর্তমানে জব্দকৃত জাহাজগুলো ইরানের সিরিক বন্দরের কাছে নোঙর করে রাখা হয়েছে এবং সেখানে আইআরজিসির কঠোর নজরদারি চলছে। বিশ্ববাসী এখন তাকিয়ে আছে ওয়াশিংটনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।
Leave a comment