বিশ্ব বাণিজ্যের ধমনী হিসেবে পরিচিত জলপথ হরমুজ প্রণালি নিয়ে নতুন করে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে ইরান। দেশটির পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার হাজি বাবায়ি ঘোষণা করেছেন, এই প্রণালি এখন থেকে সম্পূর্ণভাবে ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং এখানে চলাচলের জন্য জাহাজগুলোকে নির্দিষ্ট হারে ‘টোল’ প্রদান করতে হবে। ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা মেহের নিউজ এজেন্সির বরাতে বিবিসি এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছে।
হাজি বাবায়ি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় জানিয়েছেন যে, হরমুজ প্রণালি তেহরানের জন্য একটি ‘রেড লাইন’ বা অলঙ্ঘনীয় সীমারেখা। তিনি দাবি করেন, এই জলপথের ওপর ইরানের সার্বভৌমত্ব প্রশ্নাতীত এবং এখানে চলাচলের ক্ষেত্রে টোল হিসেবে কেবল ইরানি মুদ্রা ‘রিয়াল’ গ্রহণ করা হবে। উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট ব্যবহৃত খনিজ তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই সংকীর্ণ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে ইরানের এই নতুন সিদ্ধান্ত বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর বড় ধরনের আঘাত হানতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সম্প্রতি পাকিস্তানের ইসলামাবাদে ইরানের সঙ্গে মার্কিন প্রতিনিধিদলের দীর্ঘ ২১ ঘণ্টার ম্যারাথন বৈঠক কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সংবাদ সম্মেলনে হরমুজ প্রণালি নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য না করলেও, কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে যে—এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ ও জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা ইস্যুটিই ছিল আলোচনার প্রধান অন্তরায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বিদ্যমান শর্তসাপেক্ষ যুদ্ধবিরতির একটি প্রধান স্তম্ভ ছিল এই জলপথকে মুক্ত ও নিরাপদ রাখা।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশাল’-এ এক পোস্টে দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালি ‘শিগগিরই খুলে দেওয়া হবে’। এরই মধ্যে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) জানিয়েছে, তাদের নৌবাহিনীর দুটি ডেস্ট্রয়ার জাহাজ সমুদ্রপথকে মাইনমুক্ত করার মিশনের অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে প্রণালিটি অতিক্রম করেছে।
তবে ওয়াশিংটনের এই দাবিকে সরাসরি অস্বীকার করেছে তেহরান। ইরান বলছে, মার্কিন কোনো যুদ্ধজাহাজ ওই জলপথ দিয়ে অতিক্রম করেনি। দেশটির প্রভাবশালী সামরিক বাহিনী ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস’ (আইআরজিসি) হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিদেশি সামরিক জাহাজ চলাচলের যেকোনো অননুমোদিত চেষ্টা কঠোরভাবে মোকাবিলা করা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, টোল হিসেবে রিয়াল ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা আরোপ করে ইরান মূলত মার্কিন ডলারের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার পাশাপাশি নিজেদের মুদ্রার মান বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে। তবে এই পদক্ষেপের ফলে আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচল সংস্থাগুলো এবং তেল আমদানিকারক দেশগুলোর সাথে ইরানের সংঘাত আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বর্তমানে হরমুজ প্রণালিতে দুই দেশের সামরিক উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে পুরো অঞ্চলে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।
Leave a comment