Home জাতীয় অপরাধ এসপি আপেলের ডেরায় ১৫ তরুণীর নিয়মিত যাতায়াত
অপরাধ

এসপি আপেলের ডেরায় ১৫ তরুণীর নিয়মিত যাতায়াত

Share
Share
কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের এসপি (সুপারনিউমারারি অতিরিক্ত ডিআইজি) আপেল মাহমুদ

প্রবাদ আছে—কয়লা ধুলে ময়লা যায় না। অনেকের মতে, কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের এসপি (সুপারনিউমারারি অতিরিক্ত ডিআইজি) আপেল মাহমুদের ক্ষেত্রে যেন সেই প্রবাদই বারবার সত্য প্রমাণিত হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর নামে কক্সবাজার সৈকতের নামকরণ করে একসময় দেশজুড়ে আলোচনায় এসেছিলেন তিনি। পরবর্তীতে বিভিন্ন বিতর্ক ও অভিযোগে বারবার সমালোচনার মুখে পড়েন এই পুলিশ কর্মকর্তা। এদিকে কক্সবাজারে উদ্যোক্তাসহ অধিক পরিচিত ১৫ তরুণীকে আপেলের ডেরায় নিয়মিত আসা-যাওয়া করতে দেখা যায়। এদের প্রায় সবাই তার লালসার শিকার হয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ৫ ভুক্তভোগী সরল স্বীকারোক্তি দিয়েছেন।

সম্প্রতি কক্সবাজারে তার কর্মকাণ্ড ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবারও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকলেও তিনি নানা অনিয়ম ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি ও জেলা প্রশাসনের অনুমোদন ছাড়াই সৈকতের একটি অংশ ভাড়া দিয়ে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। লাবণী থেকে কলাতলী পয়েন্ট পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকায় একটি স্টিল কোম্পানির বিজ্ঞাপন বসানোর ক্ষেত্রেও অনুমোদন না নিয়েই কাজটি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি দেশ যখন ভোটের ব্যস্ততা পার করছিল, ঠিক তখন ট্যুরিস্ট পুলিশের সদস্যদের পাহারায় লাবণী থেকে কলাতলী পয়েন্ট পর্যন্ত তিন কিলোমিটার লোহার খুঁটি দিয়ে জুলফিকার নামে একটি রড কোম্পানির বিজ্ঞাপন বসাতে দেখা গেছে। এ সময় উপস্থিত পুলিশ সদস্যদের কাছে জানতে চাইলে তারা জানান, অ্যাডিশনাল ডিআইজি আপেল মাহমুদের নির্দেশে এটি বসাতে সহযোগিতা করছে ট্যুরিস্ট পুলিশ। হোয়াটসঅ্যাপে এর ছবি পাঠিয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজার অতিরিক্ত ম্যাজিস্ট্রেট (এটিএম) শহিদুল ইসলাম জানান, এ বিষয়ে কোনো ধরনের অনুমোদন নেওয়া হয়নি এবং জেলা প্রশাসনের অনুমোদন ছাড়া বিচ এলাকায় কোম্পানির বিজ্ঞাপন বসানোর সুযোগ নেই বলে জানান তিনি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ট্যুরিস্ট পুলিশের কয়েকজন সদস্য ও সংশ্লিষ্ট কোম্পানির একজন কর্মকর্তা জানান, জেলা প্রশাসন অনুমোদন দিচ্ছে না, তাই আপেল মাহমুদকে ৩০ লাখ টাকা দিয়ে তার সহযোগিতায় জুলফিকার স্টিল এসব বিজ্ঞাপন বসিয়েছে। বিষয়টি আপেল মাহমুদকে তাৎক্ষণিক অবগত করলে আর কখনো এমন ভুল করবেন না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ৩০ মিনিটের ব্যবধানে কয়েকটি বিজ্ঞাপনসমৃদ্ধ স্টিলের খুঁটি সরিয়ে ভিডিও করে প্রতিবেদকের হোয়াটসঅ্যাপে পাঠান। যদিও সবশেষ ৩ মার্চ রাতে সরেজমিনে বিচ ঘুরে জুলফিকার স্টিলের বিজ্ঞাপনের সাইনবোর্ড অক্ষত দেখা গেছে।

এখানেই শেষ নয়, পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য নির্মিত ওয়াচ টাওয়ার, অভিযোগ কেন্দ্র, পুলিশ বক্স এমনকি সরকারি জেটস্কি অবৈধভাবে ভাড়া দিয়ে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন এসপি আপেল মাহমুদ। লাবণী পুলিশ ফাঁড়ির সামনে স্থাপিত একটি ওয়াচ টাওয়ার রেস্টুরেন্টে রূপান্তর করে অবৈধভাবে ভাড়া দেওয়া হয়। অগ্রিম হিসেবে নেওয়া হয় ৮ লাখ টাকা। রেস্টুরেন্টটির নাম দেওয়া হয় অর্ণব ক্যান্টিন। পরে বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে সেটিকে ট্যুরিস্ট পুলিশ ক্যান্টিন নামে চালানো শুরু করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধান ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কটেজ জোনের পতিতালয় ও অবৈধ স্পা থেকে মাসোয়ারা আদায় করেন আপেল মাহমুদ। একেকটি কটেজ ও পতিতালয় থেকে তাকে প্রতি মাসে ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত মাসোয়ারা দিতে হয়। এসব হাব থেকে ১৫ লাখ টাকা চাঁদা তোলা হয়। কথিত কয়েকজন দালাল ও স্থানীয় নামধারী সাংবাদিকের মাধ্যমে এসব টাকা তোলা হয়। এসব দালালদের সঙ্গে নিয়ে প্রতিদিন সন্ধ্যায় সায়মন হেরিটেজ বিলাসবহুল রেস্টুরেন্টে নিয়মিত আড্ডা দেন আপেল। বিষয়টি স্বীকার করেছেন সায়মন হেরিটেজ কর্তৃপক্ষ। দালালদের সঙ্গে প্রতি রাতে বসে মাদকের আসর। যা সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করলে প্রমাণ পাওয়া যাবে।

এদিকে কক্সবাজারে উদ্যোক্তাসহ অধিক পরিচিত ১৫ তরুণীকে আপেলের ডেরায় নিয়মিত আসা-যাওয়া করতে দেখা যায়। এদের প্রায় সবাই তার লালসার শিকার হয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ৫ ভুক্তভোগী সরল স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। তাদের কারও দাবি, সায়মনে ফ্ল্যাট কিনে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন আপেল। কারও দাবি, বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতারণা করেছেন। এদের মধ্যে দুজন সহযোগিতা পেলে তার বিরুদ্ধে মামলা করবেন বলে জানান। স্পা সেন্টার থেকে কাউকে পছন্দ হলে দুজন কথিত সাংবাদিক এসে আপেলের কথা বলে তাকে নিয়ে যান। অতিথিদের পাশাপাশি তারাও মাঝে মাঝে শারীরিক সম্পর্ক করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

২৮ অক্টোবর ৯৯৯ নম্বরে ফোন পেয়ে অভিযান চালিয়ে লায়লা পরী নামে এক মেয়েকে জিম্মি দশা থেকে উদ্ধার করে উখিয়া থানা পুলিশ। উদ্ধারের পর তাৎক্ষণিক সাংবাদিকদের কাছে ওই মেয়ে ভিডিও বার্তায় জানান, তাকে তার স্বামী রাকিব আপত্তিকর ভিডিও ধারণ করে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে গিয়ে প্রভাবশালী মানুষের সঙ্গে বিছানায় যেতে বাধ্য করতেন। তার মধ্যে কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের এসপি আপেল মাহমুদ একজন। ওই ভিডিও বার্তায় লায়লা দাবি করেন, ২ সপ্তাহ আগে জুসের সঙ্গে কিছু মিশিয়ে তাকে কলাতলীর একটি হোটেলে নিয়ে আপেল মাহমুদ ধর্ষণ করেন। পরের দিন সকালে এসে তাকে রুম থেকে নিয়ে যান তার স্বামী।

ওই দিন প্রতিবেদক মেয়েটির ছবি আপেল মাহমুদকে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে তাকে চেনেন কিনা জানতে চাইলে তিনি আতঙ্কিত হয়ে তার ক্যারিয়ার ধ্বংস না করার জন্য অনুরোধ জানান। পরে নিজেকে রক্ষায় অপকৌশল হিসেবে গোপনে ওই নারীর বিরুদ্ধে থানায় জিডি করেন এবং একাধিক নিউজ ডকুমেন্ট করে রাখেন।

২০২৫ সালের ৭ নভেম্বর সুগন্ধা হাইপেরিয়ান সি ওয়ার্ড নামের একটি আবাসিক হোটেলের কার্যালয়ে ইয়াবার একটি চালান রাখা হয়েছে—এমন সংবাদের ভিত্তিতে আপেল মাহমুদসহ ট্যুরিস্ট পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। ঘটনাস্থল থেকে ইয়াবাসহ হোটেলের এক স্টাফকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে পুলিশ। একপর্যায়ে জানা যায়, উদ্ধার হওয়া ইয়াবাগুলো শাহজাহান নামের এক পরিচালকের। পরে আপেল মাহমুদের সঙ্গে ১০ লাখ টাকায় বিষয়টি রফাদফা হয়।

আরও অভিযোগ রয়েছে, ঘটনাস্থলে প্রায় ২০ হাজার ইয়াবা থাকলেও মামলায় মাত্র ২০০ পিস ইয়াবা জব্দ দেখিয়ে হোটেলের এক স্টাফকে আসামি করা হয়। এসব পরিস্থিতি সামলানোর জন্য আপেল গড়ে তুলেছেন রোহিঙ্গাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দাগি অপরাধীদের জড়ো করে ‘সাংবাদিক বাহিনী’। তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে মাদকসহ নানা অপরাধে ডজন ডজন মামলা রয়েছে। তাদের সংখ্যা অন্তত ৩০ জন। এসব দাগি অপরাধীরা ইতোমধ্যে ‘সাংবাদিক উন্নয়ন পরিষদ’ নামের একটি সংগঠনের প্যাডে আপেল মাহমুদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের কোনো সত্যতা নেই বলে ৫ জন স্বাক্ষরসহ একটি বিবৃতি দিয়েছেন।

এসব বিষয় জানতে চাইলে এসপি আপেল মাহমুদ প্রতিবেদককে বড় ভাই সম্বোধন করে বলেন, “আপনি হলেন আমার বড় ভাই, আপনার কাছে সারেন্ডার করছি। আমি ফেসবুক থেকে সবকিছু এখন ডিলিট করে দিচ্ছি। ভয়ে বাঁচার জন্য এসব করেছি।”

তিনি বলেন, “আপনি যা বলেন তার বাইরে আমি চলব না। কলিজার ভাই আমার, আপনি যেমন নির্দেশ দেবেন তেমন করে চলব, আর কোনো কথা বলব না। আমি আমার ঊর্ধ্বতনদের বলেছি সাংবাদিকের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝির কারণে এসব হচ্ছে, আপনিও একটু তাই বলে দেন।”

 

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Don't Miss

ভারতে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের পুষ্টিকর খাবারের প্যাকেটে মৃত সাপ, তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ

ভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যে সরকারি পুষ্টি সহায়তা কর্মসূচির আওতায় বিতরণ করা খাদ্যের নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের কেলেঙ্কারি ও চরম গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে। রাজ্যের পন্ধুর্না...

চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরে ‘পার্টনার’ প্রকল্পের পার্টনার কংগ্রেস অনুষ্ঠিত

চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরে প্রোগ্রাম অন অ্যাগ্রিকালচারাল অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন, এন্টারপ্রেনারশিপ অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ (পার্টনার) প্রকল্পের আওতায় পার্টনার কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়েছে। সোমবার...

Related Articles

পাবনায় কিশোরী ধর্ষণ-হত্যার জেরে অগ্নিসংযোগ ৩ জনের মৃত্যু

পাবনা সদর উপজেলায় এক কিশোরীকে গণধর্ষণ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের জেরে আসামিদের ঘরবাড়িতে...

গফরগাঁওয়ে জন্মদিন পালনের পর কলেজ ছাত্রকে কুপিয়ে হত্যা

ময়মনসিংহের গফরগাঁও পৌরশহরে এক নির্মম ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। বন্ধুদের সাথে...

কক্সবাজারে ডাকাতির ঘটনায় মা ও মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগ, আটক ৬

কক্সবাজারের নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলায় ডাকাতির পর এক গৃহবধূ ও তাঁর কিশোরী মেয়েকে...

প্রকৌশলীর ঘুষ নেওয়ার ভিডিও ফেসবুকে, বললেন—‘আমি কি এক হাজার টাকা নেওয়ার প্লেয়ার?’

দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলায় সড়ক নির্মাণকাজের সময় উপসহকারী প্রকৌশলী হামিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে ঠিকাদারের...