বাড়ি সংস্কারের নামে এক নির্মাতাকে ৭২ হাজার পাউন্ড দেওয়ার পর অসমাপ্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ বাড়িতে তিন সন্তানকে নিয়ে বসবাস করছিলেন যুক্তরাজ্যের বধির দম্পতি রিফাত ও আহমেদ আলী। তাঁদের দুর্দশার কথা জানতে পেরে বাড়িটি নতুন করে সাজিয়ে দিতে এগিয়ে আসেন ১৫০ জন স্বেচ্ছাসেবী। নতুন বাড়িতে ফিরে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন দম্পতি।
বিবিসি ওয়ানের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘ডিআইওয়াই এসওএস’-এর গত বুধবারের (৭ অক্টোবর) পর্বে উঠে এসেছে দক্ষিণ ইংল্যান্ডের সাউদাম্পটনের এই পরিবারের দুর্ভোগ ও ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প।
ডেইলি মেইলের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছরের এপ্রিলে বাড়ির নিচতলায় সম্প্রসারণের কাজ করাতে এক নির্মাতার সঙ্গে চুক্তি করেন রিফাত ও আহমেদ। তাঁদের তিন সন্তান ইসমাইল, হিবা ও আদম। তাঁদের ছোট ছেলে আদম অটিজমে আক্রান্ত। সন্তানদের দিকে সহজে নজর রাখতে এবং পরিবারের প্রয়োজন অনুযায়ী বাড়ির ভেতরের বিন্যাস বদলাতে চেয়েছিলেন তাঁরা।
আহমেদ ব্রিটিশ সাংকেতিক ভাষায় বলেন, আদমের অটিজমের কথা বিবেচনা করেই তাঁরা বাড়ির পরিবর্তন করতে চেয়েছিলেন। এ ছাড়া বাড়ির আগের বিন্যাস বধির মানুষের জন্যও সুবিধাজনক ছিল না।
কিন্তু নির্মাণকাজ শুরুর পর থেকেই নানা সমস্যায় পড়েন তাঁরা। রিফাতের অভিযোগ, নির্মাতারা কাজ করতে এসে চলে যেতেন, পরে আর ফিরতেন না। অন্যদিকে, নির্মাতা তাঁদের কাছে বারবার টাকা চাইতে থাকেন। এমনকি যেসব নির্মাণসামগ্রী সরবরাহ করা হয়নি, সেগুলোর জন্যও টাকা নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন দম্পতি।
একপর্যায়ে ওই নির্মাতার বিরুদ্ধে আগে আদালতে মামলা হওয়ার তথ্য জানতে পারেন তাঁরা। পরে কাজ বন্ধ করে দেন। তত দিনে নির্মাতাকে ৭২ হাজার পাউন্ড দিয়ে ফেলেছিলেন তাঁরা। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা কয়েক কোটি টাকা।
নির্মাণকাজ অসমাপ্ত রেখে চলে যাওয়ায় বাড়ির অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়। রান্নাঘর ভেঙে ফেলা হয়েছিল। দেয়াল ভাঙা, মেঝেতে বড় বড় ফাঁক এবং ছাদ থেকে বৈদ্যুতিক তার ঝুলে থাকার কারণে বাড়িটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। রান্নার জায়গা না থাকায় টানা তিন মাস শোবার ঘরে খাবার তৈরি করতে হয়েছে পরিবারটিকে।
আহমেদ বলেন, সন্তানদের নিরাপদে চলাফেরার সুযোগ ছিল না। বিশেষ করে আদম নিচতলায় ঘুরে বেড়াতে ও নিজের মতো সময় কাটাতে চাইত। কিন্তু বাড়ির এমন পরিস্থিতিতে তা কঠিন হয়ে পড়েছিল।
রিফাত বলেন, তাঁরা সন্তানদের সামনে ইতিবাচক থাকার চেষ্টা করতেন। কিন্তু পরিস্থিতি সামাল দেওয়া তাঁদের জন্য খুব কঠিন হয়ে পড়েছিল। সন্তানদের ঘুম পাড়ানোর পর তিনি কাঁদতেন বলেও জানান।
একপর্যায়ে ওই নির্মাতা আরও টাকা দাবি করতে তাঁদের বাড়িতে এলে পুলিশ ডাকতে বাধ্য হন দম্পতি। তাঁদের অভিযোগ, নির্মাতা দরজায় এসে টাকা দাবি করছিলেন এবং চলে যেতে চাইছিলেন না। পরে পুলিশ এসে বিষয়টি সামাল দেয়। নির্মাতাকে আর বাড়িতে না ফেরার বিষয়ে সমঝোতা হয়।
অনুষ্ঠানটির উপস্থাপক নিক নোলস বাড়িটি পরিদর্শন করে একে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। পরিবারের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সংস্কারকাজ চলাকালে তাঁদের অন্যত্র থাকার পরামর্শ দেন তিনি।
তিন সপ্তাহ পর নিক নোলস ১৫০ জন নির্মাণকর্মী, প্লাম্বার, ইলেকট্রিশিয়ানসহ স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়ে বাড়িটিতে ফিরে আসেন। এত মানুষের উপস্থিতি দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন আহমেদ। তিনি বলেন, তাঁদের জীবনের কঠিন সময়ে এই উদ্যোগ যেন আশার আলো হয়ে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বেচ্ছাসেবীরা প্রায় ছয় মাসের সমপরিমাণ কাজ মাত্র সাত দিনে শেষ করেন। বাড়িটিকে নতুন করে সাজানোর পাশাপাশি পরিবারের প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন প্রযুক্তিগত সুবিধাও যুক্ত করা হয়।
শিশুদের শোবার ঘরে এমন সেন্সর বসানো হয়েছে, যা তারা চিৎকার করলে বা কাঁদলে আলো জ্বালিয়ে সংকেত দেবে। এ ছাড়া রিফাত ও আহমেদের শোবার ঘরে বসানো হয়েছে কম্পনযুক্ত অগ্নিসংকেতব্যবস্থা, যাতে তাঁরা আগুন লাগার সতর্কবার্তা বুঝতে পারেন।
নতুন বাড়িতে ফিরে নিজেদের আবেগ ধরে রাখতে পারেননি রিফাত ও আহমেদ। বাড়ির পরিবর্তন দেখে তাঁরা বারবার মুগ্ধতা প্রকাশ করেন। আহমেদ বলেন, প্রযুক্তিগত সুবিধাগুলো দেখে তাঁর মনে হচ্ছে, এটি যেন জেমস বন্ডের বাড়ি।
স্বেচ্ছাসেবীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আহমেদ বলেন, বাড়িটি এখন উষ্ণ, উজ্জ্বল ও তাঁদের স্বপ্নের মতো হয়েছে। মানুষ একসঙ্গে এগিয়ে এলে কত কিছু করা সম্ভব, এই উদ্যোগ তারই প্রমাণ।
Leave a comment