ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বিশ্বাস করতেন না। এ কারণে ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) মাধ্যমে তাঁদের ফোনকল রেকর্ড ও নজরদারি করতেন বলে দাবি করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন।
রোববার (৯ আগস্ট) বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময় এ দাবি করেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ শীর্ষ সাত নেতার বিরুদ্ধে করা মামলায় তৃতীয় দিনের মতো যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে প্রসিকিউশন।
প্রসিকিউটর তামিম বলেন, শেখ হাসিনা এনটিএমসির প্রধান হিসেবে মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানকে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তাঁর মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তির ফোনকল রেকর্ড করা হতো বলে প্রসিকিউশনের দাবি।
এদিন ট্রাইব্যুনালে ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক এবং যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশের পৃথক দুটি ফোনালাপ বাজিয়ে শোনানো হয়। আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতাদের আরও কয়েকটি কথোপকথনের উদ্ধৃতিও তুলে ধরা হয়।
তামিম সাংবাদিকদের বলেন, ট্রাইব্যুনালে মোট ১৪টি কথোপকথন উপস্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে ওবায়দুল কাদের ও জুনাইদ আহমেদ পলকের একটি কথোপকথন ইতিমধ্যে দালিলিক প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রসিকিউশনের দাবি, ওই কথোপকথনে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই ইন্টারনেট সেবা সীমিত করার নির্দেশ দেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। পরে শেখ হাসিনার অনুমোদন নিয়ে তা কার্যকর করেন পলক।
তামিম আরও বলেন, ১৬ জুলাই সন্ধ্যা ছয়টা থেকে দেশের ৫৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ে থ্রি-জি ও ফোর-জি নেটওয়ার্ক বন্ধের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। আন্দোলনের সময় ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও টিকটকসহ কয়েকটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও বন্ধ করা হয় বলে তিনি দাবি করেন।
প্রসিকিউটর বলেন, ওবায়দুল কাদের, তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদসহ আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে শেখ হাসিনার কথোপকথনে আন্দোলনকারীদের ‘সন্ত্রাসী’, ‘জঙ্গি’, ‘বিএনপি-জামায়াত’ ও ‘রিলিজিয়াস অ্যাক্টিভিস্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করার বিষয়টি উঠে এসেছে।
এ সময় শেখ হাসিনার একটি কথোপকথনের উদ্ধৃতি তুলে ধরে তামিম বলেন, সেখানে আন্দোলনকারীদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে আগুন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার কথা শোনা যায়। এসব কথোপকথন সিআইডির ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
এনটিএমসি প্রসঙ্গে তামিম বলেন, শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে চালু হওয়া এই ব্যবস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তির ফোনকল রেকর্ড করা হতো। তাঁর দাবি, শেখ হাসিনা যাঁদের সঙ্গে কথা বলতেন, তাঁদের ফোন নম্বর এনটিএমসির ব্যবস্থায় থাকায় ওই ব্যক্তিদের সঙ্গে অন্যদের কথোপকথনও রেকর্ড হয়ে যেত।
প্রসিকিউশনের দাবি, এসব কল রেকর্ডে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতা-কর্মীর প্রাণঘাতী অস্ত্র ও হেলিকপ্টার ব্যবহার করে গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া আন্দোলন প্রতিহত করতে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের অর্থ দেওয়া, অর্থের উৎস ও তা সংগ্রহের পদ্ধতি নিয়ে ওবায়দুল কাদেরের একটি কথোপকথনও ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে জানান প্রসিকিউটর।
Leave a comment