সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে বেসরকারি ক্লিনিকে নেওয়ার দালাল চক্রের অপতৎপরতা স্থায়ীভাবে বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
বুধবার সকালে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে ‘বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ঘাটতি নিরসন: সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার উপযোগী সেবা নিশ্চিত করতে ব্যয় দক্ষতার একটি দ্রুত প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মূল্যায়ন’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। গবেষণাটি যৌথভাবে পরিচালনা করে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট।
অনুষ্ঠানে গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। স্বাগত বক্তব্য দেন স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক ড. মো. এনামুল হক।
গবেষণাটি দেশের আটটি বিভাগের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও তৃতীয় পর্যায়ের ২২টি সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে পরিচালিত হয়। এতে ২০২৪–২৫ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়ন, সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়া ও প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা হয়। পাশাপাশি ৯৫ জন কর্মকর্তার ওপর জরিপ এবং প্রতিষ্ঠানপ্রধান, নীতিনির্ধারক, সরবরাহকারী, শিক্ষাবিদ ও রোগীদের সঙ্গে ৩২টি সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে জরিপভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর গড় বাজেট বাস্তবায়নের হার ছিল ৮৫ শতাংশ। এর মধ্যে মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানে এ হার ছিল সবচেয়ে কম, ৭৮ শতাংশ। অর্থবছর শেষে ৯৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে অব্যয়িত অর্থ থাকলেও মাত্র ১১ শতাংশ প্রতিষ্ঠান আর্থিক অব্যবস্থাপনাকে উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছে।
টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে অনেক সময় অবাস্তব যোগ্যতার শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়, যাতে প্রতিযোগিতা সীমিত হয়ে যায়।
স্বাস্থ্য খাতে অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা ও সরকারি অর্থ অপচয়ের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, অতীতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ছাড়াই ব্যয়বহুল চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা হয়েছে, যার অনেকগুলো এখন অচল অবস্থায় পড়ে আছে।
সরকারি হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করে পাশের বেসরকারি ক্লিনিকে রোগী পাঠানো, কমিশনের বিনিময়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো এবং চিকিৎসাসেবা বাণিজ্যিকীকরণের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারির কথাও জানান তিনি।
হামের টিকাদান কর্মসূচি প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, অতীতে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছিল। বর্তমানে হামে আক্রান্ত অধিকাংশ শিশুই টিকা না পাওয়া। তাই টিকাদান কর্মসূচি আরও জোরদার করা হয়েছে এবং নতুন করে এক লাখের বেশি শিশুকে এর আওতায় আনা হয়েছে।
ডায়ালাইসিস সেবা প্রসঙ্গে তিনি জানান, একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে তা নবায়ন করা হবে না। সরকার নিজস্ব উদ্যোগে ডায়ালাইসিস মেশিন সংগ্রহ করবে। একই সঙ্গে প্রতিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫০ শয্যা এবং প্রতিটি জেলা হাসপাতালে ১০ শয্যার ডায়ালাইসিস কেন্দ্র চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদারে পরীক্ষামূলকভাবে ১০টি উপজেলা ও ৯০টি ওয়ার্ডে স্বাস্থ্যকর্মীদের সাইকেল, স্মার্টফোন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)–সমৃদ্ধ কিট সরবরাহ করা হবে বলেও জানান মন্ত্রী। এসব স্বাস্থ্যকর্মী বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করবেন।
মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, অডিটের নামে কোনো ধরনের অনৈতিক অর্থ লেনদেন বরদাশত করা হবে না।
স্বাভাবিক প্রসবের হার বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার রোধে সারা দেশে বেসরকারি ক্লিনিকে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় মানদণ্ড না মেনে পরিচালিত বেশ কয়েকটি ক্লিনিক ইতিমধ্যে বন্ধ করা হয়েছে এবং এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক দিল আফরোজাসহ স্বাস্থ্য খাতের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
Leave a comment