ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বাংলাদেশ কংগ্রেস সমর্থিত মেয়র প্রার্থী শামীম আহমদ বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সমর্থন চেয়েছেন। তিনি আসন্ন নির্বাচনে ঢাকা উত্তরে বিএনপির কোনো প্রার্থী না দিয়ে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থনের আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ কংগ্রেসের নেতা শামীম আহমদ জানিয়েছেন, তিনি আসন্ন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলটির সমর্থিত মেয়র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। এর আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ঢাকা-১৭ আসনে বাংলাদেশ কংগ্রেসের মনোনয়ন নিয়ে অংশ নেন। পরে তিনি ওই নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়ে একই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বিএনপির তারেক রহমানকে সমর্থন দেন।
শামীম আহমদ বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার সমর্থন বিএনপির প্রার্থীর জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। সেই প্রেক্ষাপটে তিনি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির সমর্থন প্রত্যাশা করছেন। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের আগে তার সমর্থনের বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রচারিত হওয়ার পর বিএনপির প্রতীক ‘ধানের শীষ’-এর পক্ষে ভোট বাড়ে বলে তিনি মনে করেন।
গত ২৪ এপ্রিল, শুক্রবার জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ কংগ্রেসের চতুর্থ কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। কাউন্সিলে দলের প্রতিষ্ঠাতা ও নবনির্বাচিত সভাপতি অ্যাডভোকেট কাজী রেজাউল হোসেন বলেন, আসন্ন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে শামীম আহমদকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে দল সমর্থন দেবে।
কাউন্সিলে শামীম আহমদকে দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম তথ্য, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। পাশাপাশি তাকে ঢাকা মহানগর উত্তর শাখার আহ্বায়কও করা হয়েছে।
শামীম আহমদ ‘নবরূপে ঢাকা’ গড়ার লক্ষ্যে তার কিছু পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার নাগরিকদের জন্য বাসযোগ্য শহর গড়ে তোলাই তার প্রধান লক্ষ্য। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ‘নবরূপে ঢাকা’ বলতে কেবল আধুনিকায়ন বা অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়; বরং সিটি করপোরেশন এলাকার বাসিন্দাদের জন্য স্বাস্থ্যকর পরিবেশে নির্বিঘ্ন জীবনযাপন নিশ্চিত করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, নগরীর সড়ক উন্নয়ন, পার্ক ও খেলার মাঠ সংস্কার এবং সৌন্দর্যবর্ধনের মাধ্যমে একটি আধুনিক ও বাসযোগ্য নগর গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে ১০০টি পার্ক ও খেলার মাঠ তৈরি বা সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান তিনি।
এছাড়া নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে ব্যানার, পোস্টার ও বিলবোর্ডের পাশাপাশি ওয়ার্ডভিত্তিক জনসংযোগ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে বলেও জানান শামীম আহমদ।
প্রার্থী শামীম আহমদের প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় যানজট কমাতে সড়ক ব্যবস্থার উন্নয়ন, সড়কের দুই পাশে হাঁটার উপযোগী ফুটপাত (ওয়াকেবল পাথ) এবং সুলভ গণপরিবহন চালুর কথা উল্লেখ রয়েছে। পাশাপাশি ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল ও সড়কে যাতায়াতকে নিরাপদ করার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
তার পরিকল্পনায় খেলার মাঠ, উদ্যান ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বাড়ানোর বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। শহরের বিভিন্ন স্থানে ভাস্কর্য স্থাপন, দেয়ালচিত্র অঙ্কন এবং পার্ক ও খেলার মাঠ আধুনিকায়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ১০০টি খেলার মাঠ তৈরি বা উন্নয়নের লক্ষ্য উল্লেখ করা হয়।
সরকারি অব্যবহৃত জায়গা চিহ্নিত করে সেগুলোকে উদ্যান হিসেবে গড়ে তোলা এবং বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। এসব স্থান নারী ও শিশুদের জন্য উন্মুক্ত রাখার প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়া যানজট ও দূষণ কমাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের কথাও উল্লেখ করা হয়।
শহরের ভেতরে পশুর হাট বসানো নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। বিকল্প হিসেবে নির্ধারিত স্থানে হাট আয়োজন এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পশু ক্রয়-বিক্রয় ব্যবস্থার ধারণা তুলে ধরা হয়েছে। কোরবানির জন্য নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ এবং পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থাপনা জোরদারের কথাও বলা হয়েছে।
তার পরিকল্পনায় নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ, অপসারণ ও পুনর্ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। নির্দিষ্ট ডাস্টবিন ও ল্যান্ডফিল ব্যবহারের মাধ্যমে যত্রতত্র বর্জ্য ফেলা নিরুৎসাহিত করার কথা বলা হয়। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন কিছু প্রণোদনামূলক ধারণাও তিনি উপস্থাপন করেছেন, যা বাস্তবায়নের বিষয়টি নির্ভর করবে নীতিগত ও আর্থিক সিদ্ধান্তের ওপর।
সড়কে অনিয়ন্ত্রিত পার্কিং নিয়ন্ত্রণ এবং রাস্তা, ফুটপাত, পার্ক ও বাজার এলাকা পরিষ্কার রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও নর্দমা পরিষ্কারের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা কমানোর উদ্যোগের কথাও বলা হয়েছে।
শিল্পকারখানা ও যানবাহনের ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণ এবং বায়ুদূষণ কমাতে সবুজায়ন বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে। নগর এলাকায় শিল্প স্থাপনা নিয়ন্ত্রণে প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।
নগরবাসীকে নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য ফেলা এবং পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে উদ্বুদ্ধ করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রার্থী শামীম আহমদের পরিকল্পনায় মশা নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত ফগিং ও লার্ভিসাইডিং কার্যক্রম পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। এলাকাভিত্তিক মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে ড্রেন ও জলাশয় পরিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে, যাতে জনস্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়।
নগরবাসীর জন্য নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। পানির বিল ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিদ্যমান নীতিমালার আলোকে প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
প্লাস্টিক ও কঠিন বর্জ্যের ব্যবহার কমানো এবং সেগুলোর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম ব্যবহার করে বর্জ্য দ্রুত অপসারণ ও নগর পরিষ্কার রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবার সহজলভ্যতা বাড়ানোর পাশাপাশি সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। আবাসন খাতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান সংস্থা ও নীতিমালার কাঠামোর মধ্যেই প্রয়োজনীয় সংস্কারের কথা বলা হয়েছে।
নগরবাসীর জন্য কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগ বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে নগর উন্নয়ন ও সৌন্দর্যবর্ধন কার্যক্রম জোরদারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
নগরের নিরাপত্তা জোরদার এবং সন্ত্রাস ও অপরাধ দমনে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অবৈধ কার্যক্রম প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে সচেতনতা বৃদ্ধি ও আইন প্রয়োগ জোরদারের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রার্থী শামীম আহমদের প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হটলাইনের মাধ্যমে নির্ধারিত ফিতে অ্যাম্বুলেন্স সেবা চালুর কথা বলা হয়েছে। উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ডে নির্দিষ্টসংখ্যক অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত রাখার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।
তার পরিকল্পনায় প্রতিটি ওয়ার্ডে স্বাস্থ্যসেবা কক্ষ স্থাপনের প্রস্তাব রয়েছে, যেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে। সেখানে নারী ও পুরুষ চিকিৎসক রাখার পাশাপাশি মাতৃত্বকালীন সেবা প্রদানের ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে। প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা বিনামূল্যে দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।
মেয়রের কার্যালয়ের কার্যক্রম নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে পরিচালনা এবং ওয়ার্ডভিত্তিক সেবা কার্যক্রম জোরদারের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। নাগরিক সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যও এতে উল্লেখ করা হয়েছে।
সিটি করপোরেশনের কার্যক্রমে অনিয়ম বা গাফিলতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। নাগরিকদের অভিযোগ গ্রহণ ও দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সরাসরি যোগাযোগের একটি ব্যবস্থার প্রস্তাবও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
জন্ম নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করার কথা বলা হয়েছে। তথ্য সংরক্ষণে দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা এবং ভুল সংশোধনের ক্ষেত্রে জবাবদিহি বাড়ানোর বিষয়টিও পরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিটি ওয়ার্ডে পার্ক স্থাপন বা উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে। শিশুদের জন্য উপযোগী সুবিধা রাখার পাশাপাশি এসব স্থানে বিনোদনের সুযোগ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য আলাদা সুবিধা রাখার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।
Leave a comment