সাভারের রানা প্লাজা ধসের ঘটনার ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও এক হাজারের বেশি শ্রমিক নিহতের ঘটনায় করা হত্যা মামলার বিচার এখনো শেষ হয়নি। মামলায় তিন ভাগের মাত্র এক ভাগ সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। একই ঘটনায় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও দুর্নীতি দমন কমিশন-এর দায়ের করা অন্য দুটি মামলাও বিচারাধীন রয়েছে।
২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারে নয়তলা রানা প্লাজা ভবন ধসে পাঁচটি পোশাক কারখানায় কর্মরত ১ হাজার ১৩৮ শ্রমিক নিহত হন এবং আহত হন ১ হাজার ১৬৭ জন। গুরুতর আহত ছিলেন অন্তত ৮১ জন। অশনাক্ত লাশের পরিচয় নিশ্চিত করতে ৩২২টি ডিএনএ নমুনা পরীক্ষা করা হলেও এখনো ১০৫টি লাশের পরিচয় জানা যায়নি।
হত্যা মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে ঢাকার জেলা জজ আদালতের প্রধান সরকারি কৌঁসুলি মো. ইকবাল হোসেন জানিয়েছেন, মোট ৫৯৪ সাক্ষীর মধ্যে এ পর্যন্ত ১৪৫ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। আগামী ৩০ এপ্রিল ম্যাজিস্ট্রেট, চিকিৎসক, সুরতহালকারী এবং তদন্ত কর্মকর্তাদের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণের কথা রয়েছে। তিনি বলেন, এসব গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য সম্পন্ন হলে মামলার যুক্তিতর্ক শুরু করা সম্ভব হবে এবং কয়েকটি ধারাবাহিক শুনানির মাধ্যমে বিচার শেষ করা যেতে পারে।
তবে বিচারকাজে দীর্ঘসূত্রতার বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ-এর নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ মনে করেন, এ ধরনের বড় ঘটনায় বিশেষ আদালতের মাধ্যমে দ্রুত বিচার হওয়া উচিত ছিল। তা না হওয়ায় মামলার অগ্রগতি দীর্ঘদিন ধরে বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় মোট ২০টি মামলা হয়েছিল, যার মধ্যে তিনটি ফৌজদারি মামলা। এর মধ্যে হত্যা মামলাটি করেন পুলিশ, নির্মাণ আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলা করে রাজউক এবং ভবন নির্মাণসংক্রান্ত দুর্নীতির অভিযোগে মামলা করে দুদক। হত্যা মামলার তদন্তে প্রায় দুই বছর সময় লেগে যায়। সরকারি কর্মকর্তাদের আসামি করার অনুমতি জটিলতায় তদন্ত আরও বিলম্বিত হয়। ২০১৬ সালে অভিযোগপত্র দাখিলের পর অভিযোগ গঠনে আরও এক বছর সময় লাগে। পরে উচ্চ আদালতে আপিলের কারণে পাঁচ বছর সাক্ষ্য গ্রহণ বন্ধ থাকে। ২০২২ সালের ৩১ জানুয়ারি পুনরায় সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। বর্তমানে মামলায় আসামি রয়েছেন ৩৭ জন; এর মধ্যে ভবনের মালিক সোহেল রানা কারাগারে এবং অন্যরা পলাতক।
এদিকে ধসে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলও-এর নেতৃত্বে গঠিত তহবিল থেকে ২ হাজার ৮৮৯ জন আহত ও নিহতদের পরিবার আর্থিক সহায়তা পেয়েছে। তবে উন্নত চিকিৎসার সুযোগের অভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের সীমাবদ্ধতায় অনেক আহত শ্রমিক এখনো কর্মহীন অবস্থায় রয়েছেন।
শ্রমিক নেতারা বলছেন, এত বছরেও বিচার শেষ না হওয়া বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করছে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
Leave a comment