পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান সামরিক সংঘাত এবার এক নজিরবিহীন মোড় নিতে যাচ্ছে। ইরানের কৌশলগত বন্দরনগরী বন্দর আব্বাসে মার্কিন বিমান বাহিনীর সাম্প্রতিক ভয়াবহ হামলার পর দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) নৌবাহিনীর নবনিযুক্ত প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আজমাইয়ের মৃত্যু নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র গুঞ্জন ও ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম গালফ নিউজের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও সামরিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘দ্য ইরান ওয়াচার’ জানিয়েছে, বেশ কিছু অসমর্থিত ও নির্ভরযোগ্য সূত্র ইঙ্গিত করছে যে, বন্দর আব্বাসে মার্কিন হামলার সময় ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আজমাই সুনির্দিষ্টভাবে মার্কিন বাহিনীর লক্ষ্যবস্তু (টার্গেট) হয়ে থাকতে পারেন। হামলায় তাঁর সম্ভাব্য মৃত্যুর বিষয়টি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে তেহরানের নীতিনির্ধারক বা সামরিক কমান্ডের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ধরনের সত্যতা স্বীকার বা মন্তব্য করা হয়নি।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, আলী আজমাইকে আইআরজিসি নৌবাহিনীর অন্যতম অভিজ্ঞ, চতুর ও জ্যেষ্ঠ কমান্ডার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই শীর্ষ পদে দায়িত্ব নেওয়ার ঠিক পূর্ব পর্যন্ত তিনি ইরানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘৫ম নৌ অঞ্চল’-এর প্রধান হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। এই বিশেষ কমান্ডটি মূলত পারস্য উপসাগর এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রধান মহাসড়ক ‘হরমুজ প্রণালি’তে ইরানের সমস্ত সামরিক চালচলন, কৌশলগত অবস্থান ও নৌ অপারেশন এককভাবে তদারকি করে থাকে।
যুদ্ধ পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর দাবি, মার্কিন হামলায় জেনারেল আজমাইয়ের মৃত্যুর খবরটি যদি শেষ পর্যন্ত সত্য প্রমাণিত হয়, তবে তা চলমান ওয়াশিংটন-তেহরান সংঘাতকে এক নজিরবিহীন ও চরম বিপজ্জনক মাত্রায় নিয়ে যাবে। একই সঙ্গে এটি হবে সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের সামরিক ও কৌশলগত নেতৃত্বের জন্য আরেকটি বড় এবং অপূরণীয় ধাক্কা।
উল্লেখ্য, চলমান এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মধ্যেই আইআরজিসির সাবেক সফল নৌপ্রধান আলী রেজা তাংসিরি নিহত হওয়ার পর থেকেই গভীর নেতৃত্বসংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল ইরানি নৌবাহিনী। সেই গুরুত্বপূর্ণ শূন্যতা ও কমান্ডের ভারসাম্য বজায় রাখতেই মাত্র গত কয়েক সপ্তাহ আগে আজমাইকে এই প্রধান অপারেশনাল কমান্ডের গুরুদায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
বর্তমানে হরমুজ প্রণালিতে অবস্থিত ইরানের প্রধান নৌঘাঁটি ‘বন্দর আব্বাস’ এখন মার্কিন-ইরান সরাসরি মুখোমুখি সংঘাতের মূল স্নায়ুকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল সরবরাহের জন্য এই আন্তর্জাতিক জলপথটি পৃথিবীর সবচেয়ে সংবেদনশীল এবং কৌশলগত মেরিটাইম চেকপয়েন্ট বা নৌ-অবরোধ অঞ্চলগুলোর একটি।
ভূরাজনীতি ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে চরম আঞ্চলিক অস্থিরতা এবং একটি পূর্ণাঙ্গ বহুপাক্ষিক যুদ্ধের আশঙ্কার এই ক্রান্তিকালে পরপর দুজন শীর্ষ নৌকমান্ডারকে হারানো বা তাঁদের অনুপস্থিতি ইরানের সামগ্রিক সামরিক কমান্ড স্ট্রাকচার (নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা) এবং প্রতিরোধ ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে।
Leave a comment