দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশী দেশ ভারত ও নেপালের কূটনৈতিক সম্পর্কের সমীকরণ নতুন করে জটিল হয়ে উঠেছে। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রির পূর্বনির্ধারিত কাঠমান্ডু সফর শেষ মুহূর্তে স্থগিত করা হয়েছে। নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ ভারতীয় সচিবের সাথে সাক্ষাতে অনীহা প্রকাশ করার পরই এই নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যাকে দিল্লির প্রতি কাঠমান্ডুর একটি ‘কড়া বার্তা’ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
সোমবার (১১ মে, ২০২৬) দুই দিনের সফরে বিক্রম মিশ্রির নেপাল পৌঁছানোর কথা ছিল। দুই দেশের নতুন সরকারের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ধারণে এই সফরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল। তবে সফরের প্রাক্কালে নেপাল স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ বর্তমানে কোনো দেশের ‘মন্ত্রী পদমর্যাদার’ নিচে কোনো প্রতিনিধির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ করছেন না। এর আগে একই কারণে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বিশেষ দূতের সঙ্গেও বৈঠক করতে রাজি হননি। এই কঠোর প্রটোকল নীতির ধারাবাহিকতায় ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গেও বৈঠক নাকচ করে দেওয়া হয়।
কূটনৈতিক মহলের মতে, কেবল প্রটোকল নয়, এই শীতল সম্পর্কের নেপথ্যে রয়েছে বিতর্কিত লিপুলেখ সীমান্ত ইস্যু। সম্প্রতি ভারত ও চীন, নেপালের দাবি করা এই ভূখণ্ড দিয়ে কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রা পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ১৮১৬ সালের সুগৌলি চুক্তির সূত্র ধরে নেপালের দাবি— লিম্পিয়াধুরা, লিপুলেখ ও কালাপানি তাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভারত ও চীনের এই যৌথ সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ কাঠমান্ডু ইতোমধ্যেই দেশ দুটির কাছে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক নোট পাঠিয়ে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে।
ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে ‘অন্যান্য ব্যস্ততার’ কথা বলে সফর স্থগিতের ঘোষণা দিলেও, এটি স্পষ্ট যে নেপালের অনড় অবস্থানের কারণেই দিল্লি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জসওয়াল এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, “সীমান্ত বিরোধ আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে ভারত সর্বদা প্রস্তুত। তবে নেপালের একতরফা ভূখণ্ড দাবি গ্রহণযোগ্য নয়।”
রাজনৈতিক এই টানাপড়েনের মধ্যেও দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক সচল রাখার আশ্বাস দিয়েছে দিল্লি। ভারত স্পষ্ট করেছে যে, বিদ্যমান চুক্তি অনুযায়ী নেপালে জ্বালানি তেল ও রাসায়নিক সার সরবরাহ অব্যাহত থাকবে।
অন্যদিকে, নেপালের শিক্ষামন্ত্রী সসমিত পোখারেল জানিয়েছেন, সীমান্ত ইস্যু নিয়ে ইতোমধ্যে ভারতের সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়েছে। তারা চায় দ্বিপাক্ষিক ও কূটনৈতিক পথেই যেন এই সংকটের স্থায়ী সমাধান হয়। তবে প্রধানমন্ত্রীর এই অনমনীয় অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নেপালের ক্রমবর্ধমান স্বকীয়তা প্রমাণের প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
Leave a comment