ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্ব এখন সুতোয় ঝুলছে। স্থানীয় নির্বাচনে দলের ঐতিহাসিক পরাজয়ের পর খোদ মন্ত্রিসভার অভ্যন্তরেই বিদ্রোহ শুরু হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদসহ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের বেশ কয়েকজন মন্ত্রী এখন প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের নির্দিষ্ট সময়সূচী (Timetable) ঘোষণার দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন। মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত অন্তত ৭২ জন লেবার এমপি প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি করেছেন, যা সরকারের অস্তিত্বকে এক নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
সাদা চোখে সরকার ঐক্যবদ্ধ মনে হলেও ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের অন্দরমহল এখন চরম বিভক্ত। জানা গেছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ মন্ত্রিসভায় সেই সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর নেতৃত্ব দিচ্ছেন যারা বিশ্বাস করেন যে, স্টারমারের এখনই সরে যাওয়া উচিত।
এই রাজনৈতিক ঝড়ের প্রথম ধাক্কা লেগেছে সরকারের জুনিয়র স্তরে। প্রধানমন্ত্রীর অনড় অবস্থানের প্রতিবাদে ইতিমধ্যে ছয়জন সংসদীয় ব্যক্তিগত সচিব (PPS) তাদের পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। এদের মধ্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং-এর সহকারী জো মরিস এবং উপ-প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ল্যামির সহকারী মেলানি ওয়ার্ডের পদত্যাগ সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পদত্যাগকারী কর্মকর্তারা স্পষ্ট জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর ওপর জনগণের আর কোনো “আস্থা বা বিশ্বাস” অবশিষ্ট নেই।
গত শুক্রবারের স্থানীয় নির্বাচনের ফলাফল ছিল লেবার পার্টির জন্য একটি দুঃস্বপ্ন। ইংল্যান্ড জুড়ে দলটি প্রায় ১,৫০০ কাউন্সিলর হারিয়েছে। শুধু তাই নয়, এক শতাব্দী ধরে আধিপত্য বজায় রাখা ওয়েলসেও লেবার পার্টি ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে। স্কটল্যান্ডে দলটির অবস্থা আরও শোচনীয়; ১২৯টি আসনের মধ্যে মাত্র ১৭টি আসন পেয়ে তারা ইতিহাসের সর্বনিম্ন অবস্থানে পৌঁছেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রিফর্ম ইউকে এবং গ্রিন পার্টির উত্থান লেবার পার্টির চিরাচরিত ভোটব্যাংকে ধস নামিয়েছে। বিশেষ করে লন্ডন ও শহরাঞ্চলে গ্রিন পার্টি লেবার সমর্থকদের একটি বড় অংশ নিজেদের দিকে টেনে নিতে সক্ষম হয়েছে। পদত্যাগকারী এমপি নওশাবাহ খান বলেন, “আমরা ব্যর্থ হলে চুপ করে বসে থাকার জন্য রাজনীতিতে আসিনি। আমাদের এখন কৌশলী পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন নেতৃত্বের আমূল পরিবর্তন।”
স্টারমারের উত্তরসূরি হিসেবে এখন মূলত দুটি নাম আলোচনায় আসছে— গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহাম এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং। বার্নহামের সমর্থকরা দাবি করছেন, দলের সাধারণ কর্মী ও ভোটারদের মাঝে বার্নহামের ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। তবে আইনি জটিলতা হলো, লেবার পার্টির নেতা হতে হলে তাকে সংসদ সদস্য (MP) হতে হবে।
অন্যদিকে, দলের ডানপন্থী অংশ ওয়েস স্ট্রিটিংকে এগিয়ে রাখতে চায়। স্ট্রিটিং অনুসারীদের দাবি, বার্নহামের সংসদীয় আসনে ফিরে আসার পথ প্রশস্ত করার আগেই নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হোক। এই অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই লেবার পার্টির বিভক্তিকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
তীব্র চাপের মুখেও প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এখনই পদত্যাগ করতে রাজি নন। মঙ্গলবার এক আবেগঘন ভাষণে তিনি স্বীকার করেন যে, সরকার কিছু ভুল করেছে। তবে তিনি দাবি করেন, “বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো সঠিক ছিল।” তিনি সতর্ক করে বলেন যে, এই মুহূর্তে তার সরে যাওয়া দেশটিকে “টোরি আমলের মতো বিশৃঙ্খলার” দিকে ঠেলে দেবে।
নিজের কর্তৃত্ব পুনরুদ্ধারের চেষ্টায় স্টারমার কিছু চমকপ্রদ ঘোষণা দিয়েছেন:
• ব্রিটিশ স্টিল জাতীয়করণ: চলতি সপ্তাহেই ব্রিটিশ স্টিলকে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় আনার জন্য আইন প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
• ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে ঘনিষ্ঠতা: ব্রেক্সিট পরবর্তী জটিলতা কাটাতে ইইউ-এর সাথে আরও নিবিড় বাণিজ্যিক সম্পর্কের ইঙ্গিত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
ইস্ট ওর্থিং ও শোরহ্যামের এমপি টম রাটল্যান্ড বলেন, “প্রধানমন্ত্রী শুধু পার্লামেন্টারি দলেই নয়, সারাদেশেই তার কর্তৃত্ব হারিয়েছেন যা আর ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়।”
প্রাক্তন উপ-প্রধানমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেয়নারও সুর পাল্টেছেন। কমিউনিকেশন ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সম্মেলনে তিনি বলেন, “আমাদের বিচার হবে কাজের মাধ্যমে, কথার মাধ্যমে নয়।” তিনি অ্যান্ডি বার্নহামকে সংসদে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারেও ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছেন, যা প্রকারান্তরে স্টারমারের বিদায় ঘণ্টা হিসেবেই দেখছেন অনেকে।
আজ সকালে অনুষ্ঠিতব্য মন্ত্রিসভার আনুষ্ঠানিক বৈঠকটি ব্রিটিশ রাজনীতির ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে। সেখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ এবং অন্যান্য বিদ্রোহী মন্ত্রীরা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর মুখোমুখি হবেন। যদি স্টারমার পদত্যাগের সময়সূচী ঘোষণা না করেন, তবে মন্ত্রিসভা থেকে আরও বড় ধরনের পদত্যাগের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
লন্ডনের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন একটিই প্রশ্ন— কিয়ার স্টারমার কি সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টিকে থাকতে পারবেন? নাকি তার নিজের দলের নেতারাই তাকে ডাউনিং স্ট্রিট থেকে বিদায় নিতে বাধ্য করবেন? ব্রিটিশ জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা এবং দলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এই দ্বিমুখী লড়াইয়ে স্টারমার এখন প্রায় একাকী। আগামীর কয়েক দিন কেবল লেবার পার্টির ভবিষ্যৎ নয়, বরং যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কোন দিকে যাবে তা নির্ধারণ করে দেবে।
Leave a comment