অযোধ্যার বাবরি মসজিদের পর এবার ভারতের আরও একটি ঐতিহাসিক মুসলিম উপাসনালয়ের আইনি মালিকানা হাতবদল হলো। মধ্যপ্রদেশের ধার জেলায় অবস্থিত একাদশ শতাব্দীর ঐতিহাসিক ‘ভোজশালা-কামাল মওলা মসজিদ’ কমপ্লেক্সকে সম্পূর্ণভাবে ‘দেবী বাগদেবীর (সরস্বতী) মন্দির’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট। শুক্রবার (১৫ মে) মুসলিম ও জৈন সম্প্রদায়ের করা সকল দাবি ও পিটিশন খারিজ করে আদালত এই রায় দেন। এর ফলে এখন থেকে সেখানে শুধু হিন্দু সম্প্রদায় নিয়মিত উপাসনার একক অনুমতি পাবে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু ও এনডিটিভির প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
মধ্যপ্রদেশের ইন্দোর হাইকোর্টের বিচারপতি বিনড কুমার শুক্লা এবং বিচারপতি অলোক আওয়াস্থির সমন্বয়ে গঠিত একটি ডিভিশন বেঞ্চ দীর্ঘ শুনানির পর ২৪২ পৃষ্ঠার এই ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন। রায়ে আদালত জানান, মুসলিম প্রতিনিধিরা চাইলে ধার জেলায় বিকল্প মসজিদের জন্য মধ্যপ্রদেশ সরকারের কাছে উপযুক্ত জমির আবেদন করতে পারেন।
একই সাথে আদালত ভারতের আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার (এএসআই) ২০০৩ সালের একটি পুরনো আদেশ সম্পূর্ণ বাতিল করে দিয়েছেন। ওই আদেশে মুসলিম সম্প্রদায়কে প্রতি শুক্রবার এই স্থানে জুমার নামাজ পড়ার আইনি অনুমতি দেওয়া হয়েছিল এবং হিন্দুদের জন্য শুধু মঙ্গলবার ও বসন্ত পঞ্চমীতে উপাসনার অধিকার রাখা হয়েছিল।
হাইকোর্ট স্পষ্ট করেছেন যে, সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক ‘অযোধ্যা রাম জন্মভূমি-বাবরি মসজিদ’ রায়ের আইনি ভিত্তির ওপর নির্ভর করেই এই রায় ঘোষণা করা হয়েছে। এ ছাড়া, ১৮০০ সালের শেষের দিকে ব্রিটিশ আমলে যুক্তরাজ্যের লন্ডন মিউজিয়ামে নিয়ে যাওয়া দেবী সরস্বতীর একটি প্রাচীন মূর্তি দেশে ফিরিয়ে এনে ভোজশালা কমপ্লেক্সে পুনঃস্থাপনের জরুরি উদ্যোগ নিতে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
হিন্দুদের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে দাবি করা হচ্ছিল যে, ভোজশালা মূলত একটি সরস্বতী দেবীর মন্দির, যা রাজা ভোজ নির্মাণ করেছিলেন। অন্যদিকে, মুসলিম পক্ষ দাবি করে আসছিল, এই স্থাপনাটি গত কয়েকশ বছর ধরে ‘কামাল মওলা মসজিদ’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং এটি একটি সক্রিয় ওয়াকফ সম্পত্তি। এই বিরোধের জেরে ২০২৪ সালে হাইকোর্টের নির্দেশে কমপ্লেক্সটিতে প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ চালানো হয়। জরিপকারী দল আদালতে দাবি করে, স্থাপনাটির স্থাপত্যশৈলী মূলত একটি সনাতন ধর্মীয় পূজার স্থান হিসেবে তৈরি হয়েছিল।
শুনানিকালে মুসলিম পক্ষের আইনি যুক্তি ছিল, ১৯৩৫ সালের আগস্টে তৎকালীন ধার রাজ্যের একটি সরকারি বিজ্ঞপ্তির (অ্যায়লান) মাধ্যমে এই স্থানকে ‘ভারত সরকার আইন, ১৯executable ৩৫’-এর অধীনে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মসজিদ ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে আদালত এই যুক্তি খারিজ করে দিয়ে বলেন, ওই মূল আইনটি ১৯৩৭ সালের এপ্রিলে কার্যকর হয়েছিল; ফলে আগের সরকারি ঘোষণার কোনো আইনি ভিত্তি নেই।
আদালতের এই রায়কে ‘ঐতিহাসিক’ উল্লেখ করে হিন্দু পক্ষ আনন্দ উল্লাসের মাধ্যমে স্বাগত জানালেও মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বকারী ‘মাওলানা কামালুদ্দিন ওয়েলফেয়ার সোসাইটি’ গভীর হতাশা ব্যক্ত করেছে। তারা জানিয়েছেন, রায়ের কপি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করে খুব শীঘ্রই দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টে এর বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করা হবে। এই রায়কে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রদেশের সংশ্লিষ্ট ধার জেলায় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জারি করেছে স্থানীয় প্রশাসন।
Leave a comment