ভারতের রাজস্থান রাজ্যের যোধপুর জেলায় এক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। এক তরুণীকে ব্ল্যাকমেইল করে দীর্ঘ চার বছর ধরে গণধর্ষণ করার পর বিচার না পেয়ে তাঁর আত্মহত্যার পর, ঘটনার সুরাহা না পেয়ে এবং অবিরত হুমকির মুখে তাঁর ছোট বোনও আত্মহত্যা করেছেন। প্রশাসনের চরম গাফিলতি ও পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে বিচার চাইতে গিয়ে দুই বোনের এমন করুণ আত্মহননের ঘটনায় পুরো রাজস্থান জুড়ে তীব্র ক্ষোভের আগুন জ্বলছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এই লোমহর্ষক ঘটনার সূত্রপাত চার বছর আগে। যোধপুরের স্থানীয় একটি ‘ই-মিত্র’ (সরকারি ডিজিটাল সেবা) কেন্দ্রের অপারেটর মহিপাল ভুক্তভোগী বড় বোনের কিছু আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও গোপনে ধারণ করে। এরপর সেই ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে মূল অভিযুক্ত মহিপাল ও তার সহযোগীরা দীর্ঘ চার বছর ধরে ওই তরুণীকে ব্ল্যাকমেইল, বিপুল অর্থ আত্মসাৎ এবং দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করে আসছিল। এই অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে গত ২০ মার্চ বড় বোন বিষপান করে আত্মহত্যা করেন।
বড় বোনের মৃত্যুর পর গত ১১ এপ্রিল ছোট বোন বাদী হয়ে মহিপাল, শিবরাজ, গোপাল, ভিজারাম, দিনেশ, মনোজ এবং পুখরাজসহ মোট ৮ জনের বিরুদ্ধে যোধপুর থানায় একটি সুনির্দিষ্ট মামলা দায়ের করেন। মামলা করার সময় তিনি পুলিশ প্রশাসনকে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছিলেন যে, দ্রুত আসামিদের গ্রেপ্তার করে বিচার করা না হলে তিনিও নিজের জীবন শেষ করে দেবেন।
অভিযোগ উঠেছে, মামলা দায়েরের পরও অপরাধীদের তাণ্ডব থামেনি এবং পুলিশও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। ছোট বোনের অভিযোগ ছিল, আসামিরা প্রকাশ্যেই ঘুরে বেড়াত এবং অহংকার করে বলত যে পুলিশ তাদের কিছুই করতে পারবে না। উল্টো মামলা তুলে না নিলে বড় বোনের সেই আপত্তিকর ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে ছোট বোনকেও মানসিকভাবে ও সামাজিকভাবে উত্যক্ত ও যৌন নিপীড়ন করা শুরু করে আসামিরা।
অবশেষে গত শুক্রবার নিজের প্রতিবাদ ও আর্তনাদ প্রশাসনের কান পর্যন্ত পৌঁছাতে ওই তরুণী স্থানীয় একটি উঁচু পানির ট্যাংকের ওপর উঠে পড়েন। সেখান থেকে তিনি চিৎকার করে আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানান এবং সবার সামনেই বিষপান করেন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
এই ঘটনার পর যোধপুরের মারওয়ার রাজপূত সমাজসহ স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠেছে। নিহতের মরদেহ যে হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছিল, তার বাইরে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে স্লোগান ও তীব্র বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। মারওয়ার রাজপূত সোসাইটির সভাপতি হনুমান সিং খাংটা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “পুলিশ শুরু থেকেই প্রভাবশালী আসামিদের আড়াল করার অপচেষ্টা চালিয়েছে। পুলিশের এই চরম নিষ্ক্রিয়তা এবং গাফিলতির কারণেই আজ দুটি নিরীহ মেয়ের প্রাণ ঝরে গেল।”
বিক্ষুব্ধ জনতা এবং নিহতের পরিবার অবিলম্বে সব আসামির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন পুলিশ কর্মকর্তাদের বরখাস্তের দাবি জানিয়েছে। পরবর্তীতে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে দ্রুত সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থার লিখিত আশ্বাস পাওয়ার পর পরিবারটি মরদেহের ময়নাতদন্তের অনুমতি দেয়।
যোধপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) পিডি নিত্যা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, “মূল অভিযুক্ত মহিপালসহ দুজনকে ইতোমধ্যে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে এবং তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়া চলছে। এ ছাড়া বাকি নামধারী অভিযুক্তদের সন্ধানে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।” ঘটনায় পুলিশের কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে একটি উচ্চপর্যায়ের বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করার আশ্বাস দিয়েছে জেলা প্রশাসন।
Leave a comment