ভারতের উত্তরপ্রদেশ রাজ্যে উন্নয়নের নামে মুসলিম ঐতিহ্য ও ধর্মীয় স্থাপনার ওপর আবারও চালানো হচ্ছে বিতর্কিত ‘বুলডোজার নীতি’। এবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নির্বাচনী এলাকা বারাণসীর ঐতিহাসিক ও মুসলিম-প্রধান অঞ্চল ডালমন্ডিতে রাস্তা সম্প্রসারণের অজুহাতে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে শত শত ঘরবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। প্রশাসনের এই উচ্ছেদ অভিযানের তালিকায় পড়েছে ২২৬ বছরের প্রাচীন একটি ঐতিহাসিক মসজিদসহ ওই এলাকার অন্তত ছয়টি পবিত্র মসজিদ। পবিত্র উপাসনালয়, শতাব্দী প্রাচীন ঐতিহ্য ও বসতভিটা হারানোর এই সরকারি উদ্যোগে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ এবং চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।
স্থানীয় সুত্রে জানা গেছে, বারাণসীর অত্যন্ত জনাকীর্ণ ও প্রাচীন মুসলিম এলাকা হিসেবে পরিচিত ডালমন্ডির সরু গলিগুলোতে গত কয়েকদিন ধরে একটানা চলছে প্রশাসনের বুলডোজার। সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পের নামে উত্তরপ্রদেশ গণপূর্ত বিভাগ (পিডাব্লিউডি) ইতিমধ্যে ১০৭টি ঘরবাড়ি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগামী ৩১ মে-র মধ্যে পুরো উচ্ছেদ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কঠোর ডেডলাইন বা সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে আকস্মিকভাবে বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়েছে শত শত নিরীহ পরিবার। উচ্ছেদ আতঙ্কে থাকা বাসিন্দারা জানান, হুট করে মাথার ওপর থেকে ছাদ এবং রুটি-রুজির একমাত্র অবলম্বন দোকানপাট কেড়ে নেওয়ায় তারা এখন পরিবার-পরিজন নিয়ে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
এদিকে, এই উচ্ছেদ অভিযানের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও বেদনাদায়ক দিকটি হলো পবিত্র মসজিদগুলোর ওপর সরকারি আঘাত। স্থানীয় চৌক থানা এলাকার অন্তর্গত মির্জা করিমুল্লাহ বেগ মসজিদ, মার্বেল ওয়ালি মসজিদ, আলী রেজা খান মসজিদ, নিসারান মসজিদ, রঙ্গিলে শাহ মসজিদ এবং ল্যাংড়ে হাফিজ মসজিদকে উচ্ছেদের জন্য চূড়ান্ত তালিকাভুক্ত করেছে বারাণসী জেলা প্রশাসন। এর মধ্যে মির্জা করিমুল্লাহ বেগ মসজিদটি ১৭০০ শতাব্দীর শেষের দিকে নির্মিত এবং এটি প্রায় ২২৬ বছরের পুরনো। এই প্রাচীন মসজিদটি এই অঞ্চলের মুসলমানদের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক আবেগের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে।
বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠন এই পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে উন্নয়নের নামে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ঐতিহ্য ও ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে অভিহিত করেছে। মসজিদের সুরক্ষায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে করিমুল্লাহ বেগ মসজিদের মুয়াজ্জিন বাবু জান ক্ষোভের সাথে জানান, “আইনি ও সাংবিধানিক রীতিনীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে যদি কোনো জোরজুলুম করা হয়, তবে মুসলমানরা তা মুখ বুজে সহ্য করবে না এবং এর তীব্র আইনি ও সামাজিক প্রতিবাদ জানানো হবে।” তিনি আরও যোগ করেন, যদি কোনো অনিবার্য কারণে সড়ক উন্নয়নের স্বার্থে মসজিদ সরাতেই হয়, তবে তা ধর্মীয় মর্যাদা ও অত্যন্ত সম্মানজনক উপায়ে অন্য কোনো উপযুক্ত স্থানে সরকারি খরচে পুনঃস্থাপন করতে হবে।
অন্যদিকে, তীব্র প্রতিবাদের মুখে বারাণসী প্রশাসন দাবি করেছে, উচ্ছেদকৃত জমির মালিকানা যদি সুন্নি বা শিয়া সেন্ট্রাল ওয়াকফ বোর্ডের অধীনে থাকে, তবেই কেবল আইন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে। অন্যথায়, বিতর্কিত ধর্মীয় স্থান স্থানান্তরের নিয়ম নীতি অনুযায়ী তা প্রশাসন নিজ দায়িত্বে সরিয়ে নেবে। এলাকাটিতে যানজট নিরসন ও আধুনিকায়নের দোহাই দিয়ে প্রতিদিন ৩টি ভারী বুলডোজার এবং শতাধিক শ্রমিক দিয়ে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় ভাঙচুর চালানো হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মোদি-যোগী সরকারের আমলে ভারতে উন্নয়নের আড়ালে সুপরিকল্পিতভাবে মুসলিম ঐতিহ্য, ইতিহাস এবং ধর্মীয় স্থাপনা ধ্বংসের যে ‘বুলডোজার সংস্কৃতি’ বা পক্ষপাতমূলক রাজনীতি চালু হয়েছে, বারাণসীর ডালমন্ডির এই ঘটনা তারই ধারাবাহিকতা। ঘরবাড়ি ও উপাসনালয় হারানোর আশঙ্কায় পুরো ডালমন্ডি এলাকায় এখন থমথমে পরিস্থিতি ও চাপা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বিরাজ করছে।
Leave a comment