Home আন্তর্জাতিক লন্ডনের রাজপথে নজিরবিহীন উত্তেজনা: ৪৩ জন গ্রেপ্তার, চার্চিলের মূর্তিতে অগ্নিশিখা , চরম উগ্রপন্থা বনাম ফিলিস্তিনপন্থী গণবিক্ষোভ
আন্তর্জাতিক

লন্ডনের রাজপথে নজিরবিহীন উত্তেজনা: ৪৩ জন গ্রেপ্তার, চার্চিলের মূর্তিতে অগ্নিশিখা , চরম উগ্রপন্থা বনাম ফিলিস্তিনপন্থী গণবিক্ষোভ

Share
Share

যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনের রাজপথ শনিবার এক অভূতপূর্ব ও বিস্ফোরক পরিস্থিতির সাক্ষী হয়েছে। ডানপন্থী গোষ্ঠী ‘ইউনাইট দ্য কিংডম’ এবং ফিলিস্তিনপন্থীদের ‘নাকবা দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত দুটি বিশাল এবং চরম প্রতিদ্বন্দ্বী বিক্ষোভ সমাবেশকে কেন্দ্র করে সমগ্র লন্ডন কার্যত একটি হাই-ভোল্টেজ নিরাপত্তা জোনে পরিণত হয়। ব্রিটিশ ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম এবং ব্যয়বহুল এই পুলিশি অভিযানে প্রায় ৮০,০০০ বিক্ষোভকারী রাস্তায় নেমে আসে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং সহিংসতা রুখতে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডকে প্রায় ৪,০০০ সশস্ত্র ও সাধারণ পুলিশ কর্মকর্তা মোতায়েন করতে হয়েছে।

এই দ্বিমুখী গণবিক্ষোভের উত্তাল তরঙ্গে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত মেট্রোপলিটন পুলিশ ৪৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। বিক্ষোভ চলাকালীন চরম উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্তে কিছু ডানপন্থী বিক্ষোভকারী ঐতিহাসিক পার্লামেন্ট স্কোয়ারে অবস্থিত স্যার উইনস্টন চার্চিলের মূর্তির ওপর চড়ে বসে এবং সেখানে ফ্লেয়ার বা অগ্নিশিখা জ্বালায়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশের সাথে বিক্ষোভকারীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ ঘটে, যার ফলে চারজন পুলিশ কর্মকর্তা আহত হন। এছাড়া উস্কানিমূলক আচরণ ও আইন লঙ্ঘনের দায়ে ছয়জন বিক্ষোভকারীর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক ‘ঘৃণাজনিত অপরাধ’-এর (Hate Crime) অভিযোগ আনা হয়েছে। একই দিনে ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত চেলসি এবং ম্যানচেস্টার সিটির মধ্যকার হাই-প্রোফাইল এফএ কাপ ফাইনাল ম্যাচটি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।

শনিবারের এই উত্তাল পরিস্থিতি নিয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার অত্যন্ত কঠোর এবং সতর্কবার্তা জারি করেছেন। চলমান এই রাজনৈতিক ও সামাজিক মেরুকরণকে তিনি “এই দেশের আত্মার জন্য লড়াই” বলে অভিহিত করেছেন। প্রধানমন্ত্রী স্টারমার উগ্র ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর তীব্র সমালোচনা করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন: “আজ বিভেদের কণ্ঠস্বর জোরালো হবে। তারা আমার চেনা দেশের প্রতিনিধিত্ব করে না, যে দেশ আমাদের সকলের। এটাই আমাদের ব্রিটেন। এমন এক ব্রিটেন যার জন্য লড়াই করা যায়।”
প্রধানমন্ত্রীর সুরেই সুর মিলিয়ে তাঁর ডেপুটি ডেভিড ল্যামি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার যুক্তরাজ্যের গণতন্ত্রের একটি মৌলিক স্তম্ভ এবং সরকার সর্বদা এটি রক্ষা করবে। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, যদি কোনো প্রতিবাদ সহিংস রূপ নেয়, তবে আদালত ও প্রশাসনের অতিরিক্ত ক্ষমতা ব্যবহার করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ডানপন্থী উগ্রপন্থী কর্মী টমি রবিনসন (যার আসল নাম স্টিফেন ইয়াক্সলি-লেনন)-এর ডাকে সকাল ৯টা থেকেই লন্ডনের কিংসওয়ে এলাকায় হাজার হাজার মানুষ সমবেত হতে শুরু করে। বিক্ষোভকারীদের হাতে ছিল ব্রিটিশ জাতীয় পতাকা ‘ইউনিয়ন জ্যাক’ এবং ‘সেন্ট জর্জের পতাকা’। বিশাল এই মিছিলটি অল্ডউইচ, স্ট্র্যান্ড, ট্রাফালগার স্কোয়ার এবং হোয়াইটহল হয়ে ঐতিহাসিক পার্লামেন্ট স্কোয়ারে এসে পৌঁছায়। দুপুর ১টা ৩৫ মিনিটে মঞ্চে উঠে টমি রবিনসন সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে এক চরম উস্কানিমূলক ও রাজনৈতিক ভাষণ দেন। তিনি বলেন:
“আপনারা কি কিয়ার স্টারমারকে দেখছেন? আজ আমি আপনাদের সবাইকে একটি প্রশ্ন করতে চাই, আপনারা কি ব্রিটেনের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত? ২০২৯ সালে আমাদের একটি সাধারণ নির্বাচন আছে। যদি আমরা ভোটার হিসেবে এখন থেকে নিবন্ধন না করি, যদি আপনারা সক্রিয় কর্মী না হন… তবে আমরা আমাদের দেশকে চিরতরে হারাবো।”
রবিনসনের এই সমাবেশে অন্যান্য বক্তাদের মধ্যে যোগ দিয়েছিলেন ‘অ্যাপ্রেন্টিস’ রিয়্যালিটি শোর প্রাক্তন প্রতিযোগী কেটি হপকিন্স, বিতর্কিত টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব অ্যান্ট মিডলটন, প্রাক্তন অভিনেতা লরেন্স ফক্স এবং সাবেক কনজারভেটিভ এমপি অ্যান্ড্রু ব্রিডজেন।

সমাবেশে সবচেয়ে আবেগঘন এবং উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্তটি তৈরি হয় যখন সুদানি এক আশ্রয়প্রার্থীর হাতে নির্মমভাবে খুন হওয়া ব্রিটিশ তরুণী রাইনন হোয়াইটের মা সিওভান হোয়াইট মঞ্চে বক্তব্য দিতে আসেন। তিনি সরাসরি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের অভিবাসন নীতিকে তাঁর মেয়ের মৃত্যুর জন্য দায়ী করেন।

অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে তিনি বলেন: “কিয়ার স্টারমার আমাদের দেশের এক জঘন্য নেতা। তিনি চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। আমি বিশ্বাস করি, এই লোকটি যদি ক্ষমতায় না থাকত, তবে আমার মেয়ে আজও বেঁচে থাকত। রাইননকে একটি স্ক্রুড্রাইভার দিয়ে ২৩ বার ছুরিকাঘাত করা হয়েছিল। হামলাকারী সুদানি অভিবাসী জার্মানি ও ইতালিতে আশ্রয় পায়নি, কিন্তু যুক্তরাজ্যে তাকে অনায়াসে থাকতে দেওয়া হয়েছে। আমার প্রশ্ন হলো—কেন? আর কত নারী ও শিশুকে এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হবে? এটা এখনই বন্ধ করতে হবে। সীমান্ত পুরোপুরি বন্ধ করুন, অবৈধদের আটকে রেখে ফেরত পাঠান।”

সমাবেশে অংশ নেওয়া নরউইচের ৬৮ বছর বয়সী বৃদ্ধা কিম অ্যান্ডারসন তাঁর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমি স্টারমারের ওপর চরমভাবে বিরক্ত। এই দেশটা একটা জগাখিচুড়ি হয়ে গেছে। অথচ আমরা যখন বৈধভাবে প্রতিবাদ করছি, আমাদের ‘চরম ডানপন্থী’ বলে তকমা দেওয়া হচ্ছে। এই দেশের দ্বৈত নীতি অত্যন্ত জঘন্য।”

ভিড়ের মধ্যে অনেক মার্কিন প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থক, ‘যিশুই জীবনের পথ’ লেখা ধর্মীয় ব্যানার এবং কট্টর জাতীয়তাবাদী স্লোগান দেখা গেছে। পুরো মিছিল থেকে “আমরা স্টারমারকে সরাতে চাই” এবং “আমরা স্বাধীনতা চাই” স্লোগানে চারপাশ মুখরিত হয়ে ওঠে। শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ওয়েস্টমিনস্টার কাউন্সিল ক্যান ও বোতলে অ্যালকোহল বহন নিষিদ্ধ করায় পুলিশকে বহু বিক্ষোভকারীর কাছ থেকে ল্যাগার বিয়ারের ক্যান বাজেয়াপ্ত করতে দেখা যায়।

বিক্ষোভের শুরুতেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইউস্টন স্টেশনের বাইরে এক ব্যক্তিকে নাটকীয়ভাবে হাতকড়া পরানোর একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ওই ব্যক্তি ‘রেইজ দ্য কালারস’ নামক কট্টরপন্থী দলের নেতা রায়ান ব্রিজ। ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশ যখন তাকে আটক করছিল, তখন পতাকা হাতে একদল বিক্ষোভকারী পুলিশকে ঘিরে ধরে তীব্র গালিগালাজ করছে এবং তাদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে চিৎকার করছে।

পরিস্থিতি শান্ত করতে এবং ভুল তথ্যের বিস্তার রোধ করতে মেট্রোপলিটন পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে তাদের কর্মকর্তাদের বডিক্যাম (Bodycam) ফুটেজ প্রকাশ করে। মেট পুলিশ এক্স (সাবেক টুইটার)-এ একটি পোস্টে স্পষ্ট করে জানায় যে, বার্মিংহামের স্টির্চলিতে ঘটা একটি ভ্যান চাপা দেওয়ার ঘটনার সাথে এই ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। স্টির্চলিতে ‘রেইজ দ্য কালারস’ দলের লাগানো ইউনিয়ন জ্যাক পতাকা নামিয়ে ফেলার পর একটি ভ্যান এক ব্যক্তিকে চাপা দিয়ে গুরুতর শারীরিক আঘাত (GBH) করেছিল, যার সন্দেহে এই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ জানায়, উগ্র জনতার মধ্য থেকে একজনকে গ্রেপ্তার করতে ব্যাপক শারীরিক ও মৌখিক প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়েছিল।

ডানপন্থীদের এই মিছিলের সমান্তরালে সাউথ কেনসিংটনে সমবেত হয়েছিল হাজার হাজার ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভকারী। প্রতি বছর ফিলিস্তিনিরা ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় তাদের লক্ষাধিক মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনাকে ‘নাকবা দিবস’ বা মহা বিপর্যয় হিসেবে স্মরণ করে। এবারের মিছিলে গাজা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বিপুল জনসমাগম ঘটে।

মিছিলটি কেনসিংটনের এক্সিবিশন রোড থেকে শুরু হয়ে ব্রম্পটন রোড, নাইটসব্রিজ এবং পিকাডিলি হয়ে প্যাল মলে গিয়ে শেষ হয়। মিছিলের শুরুতেই আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে বিতর্কিত স্লোগান “নদী থেকে সাগর পর্যন্ত ফিলিস্তিন মুক্ত হবে” (From the river to the sea, Palestine will be free) প্রতিধ্বনিত হতে থাকে, যা নিয়ে ব্রিটিশ রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের বিতর্ক রয়েছে।

ফিলিস্তিনপন্থী এই বিক্ষোভে কিছু বিতর্কিত ও চরমপন্থী উপাদান লক্ষ্য করা গেছে। অনেক বিক্ষোভকারী মুখে কালো কাপড় ও মাস্ক পরেছিলেন। পুলিশ সাউথ কেনসিংটনে আইন অনুযায়ী মাস্ক খুলতে অস্বীকার করায় এক নারীকে গ্রেপ্তার করে। এছাড়া রিফর্ম ইউকে নেতা নাইজেল ফারাজের ছবিযুক্ত মাস্ক পরিহিত কমলা রঙের জাম্পস্যুট পরা একটি দলকেও মাস্ক অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়।
বিক্ষোভকারীদের বহন করা কিছু প্ল্যাকার্ডে তীব্র জায়নবাদী-বিরোধী এবং ইহুদি-বিদ্বেষী স্লোগান দেখা যায়, যেখানে দাবি করা হয় যে যুক্তরাজ্য সরকার পুরোপুরি ‘জায়নবাদী লবি’ দ্বারা পরিচালিত ও কলুষিত। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় ছিল, বহু বিক্ষোভকারীর হাতে লাল রঙের উল্টো ত্রিভুজ (Inverted Red Triangle) আঁকা প্ল্যাকার্ড ছিল। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই লাল ত্রিভুজটি সরাসরি ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের সামরিক শাখার প্রতি সহানুভূতির প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল: “শহীদরা মরে না। তাদের রক্তই নতুন বিপ্লবের জন্ম দেয়।”

লেবার পার্টির প্রাক্তন প্রবীণ এমপি ডায়ান অ্যাবট প্যাল মলের এক বিশাল সমাবেশে বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন। তিনি ফিলিস্তিনপন্থী এই আন্দোলনকে ব্রিটিশ রাজনীতির একটি টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে উল্লেখ করে বলেন:”যারা এই বিক্ষোভগুলো আয়োজন করেছেন এবং অংশ নিয়েছেন, তারা গাজার গণহত্যার বিরোধিতা করে ব্রিটিশ রাজনীতির মূল চরিত্রটি পরিবর্তন করতে সাহায্য করেছেন। আপনারা আমাদের রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তারকারী শক্তিগুলোর আসল কুৎসিত রূপ উন্মোচন করেছেন এবং দিন দিন এক নতুন ধরনের প্রগতিশীল রাজনীতির পথ তৈরি করছেন।”

তিনি আরও যোগ করেন যে, ফিলিস্তিনপন্থী এবং সাধারণ মানুষ আজ ‘চরম ডানপন্থী’দের রূপে এক সাধারণ শত্রুর মুখোমুখি। এই ফ্যাসিস্ট ও কৃষ্ণাঙ্গ-বিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি।

দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী ও চরমপন্থী আদর্শের বিশাল জনস্রোত যেন লন্ডনের রাস্তায় মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত না হয়, সেজন্য মেট্রোপলিটন পুলিশ একটি সুনিপুণ কৌশল অবলম্বন করে। পুলিশ দুটি মিছিলের মাঝখানে একটি বিশাল ‘স্টেরাইল জোন’ বা ‘নিষ্ক্রিয় অঞ্চল’ গড়ে তোলে, যার ফলে দুই পক্ষের বিক্ষোভকারীরা একে অপরের সংস্পর্শে আসতে পারেনি।

মেট্রোপলিটন পুলিশের ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট জেমস হারম্যান জানিয়েছেন, এই অভিযানের ব্যাপকতা সাম্প্রতিক বছরগুলোর সমস্ত রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। এই একক অপারেশনটি পরিচালনা করতে বাহিনীর প্রায় ৪.৫ মিলিয়ন ব্রিটিশ পাউন্ড (প্রায় ৪৫ কোটি টাকা) খরচ হয়েছে। এর মধ্যে ১.৭ মিলিয়ন পাউন্ড ব্যয় হয়েছে লন্ডনের বাইরের অন্যান্য কাউন্টি থেকে অতিরিক্ত পুলিশ কর্মকর্তা এবং বিশেষজ্ঞ স্কোয়াড আনার জন্য। অভিযানে হাজার হাজার মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তার পাশাপাশি সাঁজোয়া যান, বিশেষায়িত পুলিশের ঘোড়া, ড্রোন, সুপ্রশিক্ষিত কুকুর এবং হেলিকপ্টার স্কোয়াড নিয়োজিত ছিল।

যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো রাজনৈতিক বিক্ষোভ দমনে পুলিশ সরাসরি লাইভ মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ প্রযুক্তি বা ‘লাইভ ফেসিয়াল রিকগনিশন’ (LFR) ব্যবহার করেছে। ক্যামেরার এই বিশেষ নেটওয়ার্কটি ক্যামডেনের কৌশলগত এলাকাগুলোতে স্থাপন করা হয়েছিল, যা সন্দেহভাজন এবং পূর্বে অপরাধের রেকর্ড থাকা ব্যক্তিদের তাৎক্ষণিকভাবে চিহ্নিত করতে সক্ষম।
তবে এই প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বায়োমেট্রিক্স অ্যান্ড সার্ভেইল্যান্স ক্যামেরা কমিশনার অধ্যাপক উইলিয়াম ওয়েবস্টার সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, এই প্রযুক্তিটি সম্পূর্ণ ‘ত্রুটিমুক্ত’ নয় এবং এর কারণে নির্দোষ নাগরিকরা হয়রানির শিকার হতে পারেন, যা পরবর্তীতে পুলিশ বাহিনীকে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারে।

এবারের লন্ডনের অস্থিরতার পেছনে আন্তর্জাতিক মহলের এবং বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ন্যাশনাল এডুকেশন ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ড্যানিয়েল কেবেদে এবং স্ট্যান্ড আপ টু রেসিজমের সহ-আহ্বায়ক সাব্বি ধালু যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছেন, এক্স (সাবেক টুইটার)-এর মালিক ইলন মাস্কের মতো আন্তর্জাতিক ধনকুবের এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বরা নিজেদের প্ল্যাটফর্মে উগ্র-ডানপন্থী বয়ানকে অবলীলায় প্রচার করার সুযোগ দিচ্ছেন। এর ফলে রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। উগ্র ডানপন্থীরা মূলত জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট এবং অর্থনৈতিক মন্দাকে পুঁজি করে বর্ণবাদ উস্কে দিচ্ছে এবং সব সমস্যার জন্য অভিবাসীদের বলির পাঁঠা বানাচ্ছে।

পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়া রুখতে ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ইমিগ্রেশন বিভাগ অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের ভাষায় ‘চরম ডানপন্থী উস্কানিদাতা’ হিসেবে চিহ্নিত ১১ জন বিদেশী নাগরিককে এই বিক্ষোভের আগেই যুক্তরাজ্যে প্রবেশে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে এবং তাদের বিমানবন্দর থেকেই ফেরত পাঠানো হয়েছে। এই তালিকায় রয়েছেন:
• ডমিনিক টারজিনস্কি (পোলিশ ডানপন্থী রাজনীতিবিদ)
• ফিলিপ ডিউইন্টার (বেলজিয়ান চরমপন্থী নেতা)
• ভ্যালেন্টিনা গোমেঘ (ইসলাম-বিরোধী মার্কিন ভাষ্যকার)
• ইভা ভ্লারডিঙ্গারব্রোক (ডাচ কট্টরপন্থী কর্মী)

নতুন সরকারি বিক্ষোভ নিষেধাজ্ঞার অধীনে ব্রিটিশ বিচার বিভাগ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, কোনো সমাবেশের আয়োজক বা বক্তা যদি মঞ্চ থেকে বর্ণবাদী বক্তব্য, চরমপন্থা বা বিদ্বেষমূলক বক্তব্য (Hate Speech) ছড়ান, তবে তাদের সরাসরি বিচারের আওতাভুক্ত করা হবে। জনশৃঙ্খলা আইনের (Public Order Act) অধীনে এই ধরনের অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ সাত বছরের কঠোর কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। পাবলিক প্রসিকিউশনের পরিচালক স্টিফেন পার্কিনসন এই প্রসঙ্গে বলেন, “এটি কোনোভাবেই সাধারণ মানুষের বাকস্বাধীনতা খর্ব করার বিষয় নয়। এটি মূলত চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে জননিরাপত্তা রক্ষা এবং ঘৃণাজনিত অপরাধ কঠোর হস্তে দমন করার একটি আইনি প্রচেষ্টা।”

শনিবারের এই দীর্ঘ ও শ্বাসরুদ্ধকর বিক্ষোভের শেষে মেট্রোপলিটন পুলিশ ফেডারেশন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ফেডারেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, লন্ডনের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং জনবল নিশ্চিত করতে হাজার হাজার পুলিশ কর্মকর্তার সাপ্তাহিক ছুটি বাতিল করা হয়েছে এবং বিশ্রামের দিন প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফেডারেশন স্পষ্ট ভাষায় সরকারকে সতর্ক করে বলেছে, “বর্তমানে ব্রিটেনের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখার জন্য আমাদের পুলিশ বাহিনীর সংখ্যা মোটেও পর্যাপ্ত নয়।”

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ শনিবার গভীর রাতে তাঁর সমাপনী বিবৃতিতে অত্যন্ত জোরালো ভাষায় বলেন, “প্রতিবাদের অধিকার আমাদের মহান গণতন্ত্রের একটি অবিচ্ছেদ্য ভিত্তিপ্রস্তর। কিন্তু যারা এই অধিকারের অপব্যবহার করে সমাজে ঘৃণা ছড়াবে বা রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর সহিংস কর্মকাণ্ড চালাবে, তাদের আইনের পূর্ণ শক্তির মুখোমুখি হতে হবে এবং সরকার এই বিষয়ে কোনো আপস করবে না।”
শনিবারের এই নজিরবিহীন বিক্ষোভ ও অস্থিরতা প্রমাণ করে যে, বর্তমান যুক্তরাজ্য এক গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক মেরুকরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা সামাল দেওয়া আগামী দিনে স্যার কিয়ার স্টারমারের লেবার সরকারের জন্য অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হতে চলেছে।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Don't Miss

নতুন বাজেটে নিত্যপণ্যে বাড়তি করের আশঙ্কা, বাড়তে পারে জনভোগান্তি

কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তুত করছে সরকার। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষ যখন চাপে রয়েছে, তখন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিভিন্ন...

এক দিনের ব্যবধানে ফের বাড়ল তেলের দাম, কোনটায় কত

ইরানকে নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলা-আটকের ঘটনায় নতুন উদ্বেগের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে আবারও বেড়েছে তেলের দাম। আজ শুক্রবার...

Related Articles

৪ বছর ধরে ব্ল্যাকমেইল ও গণধর্ষণ: বিচার না পেয়ে দুই বোনের আত্মহত্যা

ভারতের রাজস্থান রাজ্যের যোধপুর জেলায় এক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। এক তরুণীকে ব্ল্যাকমেইল...

জরুরি অবস্থা ঘোষণা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার

কঙ্গো ও উগান্ডায় ইবোলা ভাইরাসের সংক্রমণ দ্রুত বাড়তে থাকায় এটিকে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের...

বাংলাদেশকে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমানের সিমুলেটর হস্তান্তর করল পাকিস্তান

বাংলাদেশকে পাকিস্তান তাদের সেরা যুদ্ধবিমান ‘জেএফ-১৭ থান্ডার ব্লক ৩’ সিমুলেটর হস্তান্তর করেছে।...

ভারতে একাদশ শতাব্দীর কামাল মওলা মসজিদকে ‘সরস্বতী মন্দির’ ঘোষণা মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের

অযোধ্যার বাবরি মসজিদের পর এবার ভারতের আরও একটি ঐতিহাসিক মুসলিম উপাসনালয়ের আইনি...